নারীদের মধ্যে PTSD বেশি কেন? 

নারীদের মধ্যে PTSD বেশি কেন? 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২১ জুন, ২০২৬

তীব্র মানসিক আঘাত বা ট্রমা জীবনের কোনও না কোনও সময়ে যে কারুর হতে পারে। কিন্তু একই ধরনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার প্রভাব সবার উপর সমান হয় না। কেউ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন, আবার কেউ দীর্ঘদিন ধরে সেই স্মৃতি ও মানসিক চাপের সঙ্গে লড়তে থাকেন। দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকা এই প্রচণ্ড চাপের কষ্টকে বলা হয় পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD)। গবেষণায় বহুদিন ধরেই দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে এই PTSD হওয়ার ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ। এতদিন এই পার্থক্যের কারণ হিসেবে সামাজিক বা পরিবেশগত বিষয়গুলিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হত। তবে স্নায়ু-জীববিজ্ঞানী ড. টিমোথি জ্যারোম-এর নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া টেক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা এক নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেটা এই যে এর কারণ লুকিয়ে থাকতে পারে মস্তিষ্কের ভেতরকার সূক্ষ্ম জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মধ্যে । গবেষকদল মস্তিষ্কের কোষে একটি বিশেষ রাসায়নিক চিহ্ন বা ‘মলিকিউলার ট্যাগ’-এর ভূমিকা খতিয়ে দেখেন। ট্যাগটির নাম কে-২৭ পলিইউবিকুইটিনেশন। কোষের বিভিন্ন প্রোটিনে এই ধরনের ট্যাগ যুক্ত হয়ে তাদের নির্দিষ্ট কাজের সংকেত দেয়। বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের উপর ভয়-স্মৃতি সম্পর্কিত একটি পরীক্ষা চালান। পরীক্ষায় ইঁদুরদের একটি নির্দিষ্ট চেম্বারে নিয়ে গিয়ে খুব হালকা বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়। পরে আবার সেই একই চেম্বারে ফিরিয়ে এনে দেখা হয়, তারা কতটা সেই অভিজ্ঞতা মনে রাখতে পেরেছে। বিশেষভাবে নজর দেওয়া হয় মস্তিষ্কের দুটি অংশে- অ্যামিগডালা এবং হিপোক্যাম্পাস। অ্যামিগডালাকে সাধারণত ভয় ও আবেগের কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়, আর হিপোক্যাম্পাস স্মৃতিমাখানো পরিস্থিতির যোগসূত্র তৈরি করে। তাতে দেখা যাচ্ছে, ওই পরিস্থিতিতে স্ত্রী ইঁদুরদের হিপোক্যাম্পাসে K27 ট্যাগের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, কিন্তু পুরুষ ইঁদুরদের ক্ষেত্রে এমন কোনও পরিবর্তন দেখা যায়নি। আরও আশ্চর্যের বিষয়, ভয় ও আবেগের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত অ্যামিগডালায় এই ট্যাগের কার্যকলাপ প্রায় অনুপস্থিত। এরপর গবেষকরা জিন-সম্পাদনা প্রযুক্তি ব্যবহার করে হিপোক্যাম্পাসে K27-এর কার্যকারিতা কমিয়ে দেন। দেখা গেল, স্ত্রী ইঁদুরদের ভয়-স্মৃতি গঠনের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ল। কিন্তু পুরুষ ইঁদুরদের স্মৃতিতে এর কোনও প্রভাব পড়ল না। ড. জ্যারোমের মতে, “পুরুষ ও নারী একই অভিজ্ঞতা মনে রাখতে পারলেও সেই স্মৃতি তৈরির জন্য তাদের মস্তিষ্ক ভিন্ন জৈবিক পথ ব্যবহার করতে পারে। ফলে শুধুমাত্র পুরুষদের উপর ভিত্তি করে তৈরি ওষুধ নারীদের ক্ষেত্রে সমান কার্যকর নাও হতে পারে”। তাছাড়া K27 ট্যাগটি স্ত্রী ইঁদুরদের হিপোক্যাম্পাসে যে প্রোটিনের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যুক্ত হচ্ছিল, তার নাম ACAT1। এই প্রোটিনের সঙ্গে আগে থেকেই আলঝাইমার রোগের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। আলঝাইমারে স্মৃতির অবনতি এবং মস্তিষ্কে ক্ষতিকর প্রোটিন জমার ক্ষেত্রে ACAT1-এর ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে করা হয়। যদিও বর্তমান গবেষণা প্রমাণ করেনি যে K27 ও ACAT1-এর এই সম্পর্কই সরাসরি আলঝাইমারের কারণ, তবুও এটি স্মৃতি গঠন ও স্মৃতিভ্রংশের মধ্যে নতুন সংযোগের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে PTSD এবং আলঝাইমারের মতো রোগে নারী-পুরুষের মধ্যে যে পার্থক্য দেখা যায়, তা বোঝার জন্য এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয় যে মস্তিষ্কের গবেষণা ও ওষুধ উন্নয়নের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ—উভয়ের জৈবিক বৈশিষ্ট্যকে সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

 

সূত্র: https://doi. org / 10. 1016 / j. bbr. 2026. 116195

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fifteen − twelve =