সময়ের হিসাব আরও নিখুঁত করতে বিজ্ঞানীরা তৈরি করছেন এক অভিনব ঘড়ি – নিউক্লিয়ার ক্লক বা পারমাণবিক নিউক্লিয়াস-নির্ভর ঘড়ি। প্রচলিত পরমাণু ঘড়িতে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের চারদিকে ঘুরতে থাকা ইলেকট্রনের শক্তির পরিবর্তনকে কাজে লাগানো হয়। কিন্তু এই নতুন ঘড়িতে সময় মাপা হবে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ভেতরে নিউট্রনের কোয়ান্টাম দশার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে। সম্প্রতি পদার্থবিদদের একটি গবেষণায় এই প্রযুক্তি বাস্তবায়নের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে।
গবেষকেরা থোরিয়াম-২২৯ আইসোটোপকে বিশেষভাবে তৈরি একটি কেলাসের মধ্যে স্থাপন করেছেন। এই আইসোটোপের নিউক্লিয়াসে শক্তির পরিবর্তন ঘটাতে তুলনামূলকভাবে খুব কম শক্তির প্রয়োজন হয়। ফলে এর নিউক্লিয়াসের মধ্যে নিউট্রনের এক কোয়ান্টাম দশা থেকে অন্য দশায় যাওয়ার প্রক্রিয়া অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। এই পরিবর্তনকেই সময় মাপার নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে চান বিজ্ঞানীরা।
এই গবেষণার অন্যতম বিশেষত্ব হল, কেলাসের পরমাণুগুলি কোন কোন নির্দিষ্ট অবস্থানে সাজানো থাকে, তা শনাক্ত করা। গবেষকেরা কেলাসের পরমাণু-পার্শ্বের (ক্রিস্টাল ল্যাটিস) মধ্যে এমন চারটি অবস্থান চিহ্নিত করেছেন, যেখানে থোরিয়াম পরমাণু থাকলে নিউক্লিয়াসের কোয়ান্টাম দশার পরিবর্তন সবচেয়ে ভালোভাবে পরিমাপ করা সম্ভব। নির্ভুল পরিমাপের জন্য এই অবস্থানগুলির সন্ধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক পরমাণু ঘড়িও অবিশ্বাস্য রকম নির্ভুল। হিসাব অনুযায়ী, এই ঘড়ি ১৩০০ কোটি বছর চললেও সময় গণনায় এক সেকেন্ডের বেশি ভুল হবে না। মহাবিশ্বের বয়সের কাছাকাছি সময় ধরে চলার পরও এমন নির্ভুলতা বজায় রাখা সম্ভব। তবে এই ঘড়িগুলিকে বাইরের বৈদ্যুতিক ও চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাব থেকে রক্ষা করতে অত্যন্ত জটিল ব্যবস্থা, বিশেষ ভ্যাকুয়াম চেম্বার এবং সুরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন হয়।
নিউক্লিয়ার ঘড়ির ক্ষেত্রে এই সমস্যা অনেকটাই কমতে পারে। কারণ, পরমাণুর নিউক্লিয়াস বাইরের পরিবেশের বৈদ্যুতিক ও চৌম্বকীয় প্রভাব থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি সুরক্ষিত। তার সঙ্গে বিশেষ কেলাসের আবরণ যুক্ত হলে ঘড়িটিকে আরও স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে অপেক্ষাকৃত ছোট ও সহজ ব্যবস্থায় অত্যন্ত নির্ভুল সময় মাপার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গবেষণাটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরাও। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস এঞ্জেলসের পদার্থবিদ এরিক হাডসনের মতে, এই গবেষণার ফলাফলের জন্য বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন অপেক্ষা করছিলেন। জার্মানির ন্যাশনাল মেট্রোলজি ইনস্টিটিউটের সময় ও কম্পাঙ্ক বিভাগের প্রধান একহার্ড পেইকও একে সলিড-স্টেট নিউক্লিয়ার ক্লক গবেষণার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে উল্লেখ করেছেন।
এই প্রযুক্তি সফলভাবে তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতে সময় পরিমাপ, মৌলিক পদার্থবিদ্যার গবেষণা এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল বৈজ্ঞানিক পরিমাপে নতুন দিশা পাওয়া যাবে।
সূত্র: Today in Science, 30 October 2026.
