নেতিবাচক ঝোঁক: কারণ ও প্রতিকার

নেতিবাচক ঝোঁক: কারণ ও প্রতিকার

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১১ আগষ্ট, ২০২৬

মানব মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই নেতিবাচক ঘটনা, সমালোচনা বা খারাপ খবরকে ইতিবাচক অভিজ্ঞতার তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেয়। মনোবিজ্ঞানে এই প্রবণতাকে নেগেটিভিটি বায়াস বলা হয়। দিনের শেষে বহু ভালো ঘটনা ঘটলেও একটি মাত্র অপ্রীতিকর মন্তব্য বা ছোট ভুলই আমাদের মনে বারবার ফিরে আসে। এই প্রবণতার শিকড় মানব বিবর্তনের ইতিহাসে নিহিত। প্রাচীনকালে বেঁচে থাকার জন্য সম্ভাব্য বিপদ দ্রুত শনাক্ত করা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই মানুষের মস্তিষ্ক এমনভাবে বিকশিত হয়েছে যে, হুমকি বা নেতিবাচক তথ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংরক্ষণ করে। এই প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অ্যামিগডালা প্রধান ভূমিকা পালন করে। এটি সম্ভাব্য বিপদের সংকেত পেলে দ্রুত সক্রিয় হয়ে স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ করে এবং শরীরকে হয় লড়ো নাহয় পালাও /fight-or-flight প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত করে। বাস্তব শারীরিক বিপদ হোক বা কর্মক্ষেত্রে কঠোর সমালোচনা—অ্যামিগডালা উভয় ক্ষেত্রেই প্রায় একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে নেতিবাচক অভিজ্ঞতাগুলো আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে দীর্ঘদিন স্মৃতিতে রয়ে যায়। তবে নেগেটিভিটি বায়াস সবসময় ক্ষতিকর নয়। এটি আমাদের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যতে আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু যখন এই প্রবণতা অতি সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখনই সেটা উদ্বেগ, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, আত্মবিশ্বাসের অভাব এমনকি বিষণ্নতার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে।

মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই দুই প্রবণতার ভারসাম্য বজায় রাখতে সচেতন অনুশীলন প্রয়োজন। বর্তমান মুহূর্তে সচেতনভাবে মনোযোগী হওয়া নেতিবাচক চিন্তার চক্র ভাঙতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে সদর্থক চিন্তা, প্রতিদিন জীবনের ভালো দিকগুলো স্মরণ করা, মস্তিষ্ককে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে শেখায়। আত্ম সহানুভূতিশীল হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে ভুল বা ব্যর্থতার পর অপ্রয়োজনীয় আত্মসমালোচনা কমে।

ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের গবেষক বারবারা ফ্রেডরিকসন দেখিয়েছেন, মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে ইতিবাচক অভিজ্ঞতার সংখ্যা নেতিবাচক অভিজ্ঞতার তুলনায় বেশি হওয়া উপকারী। এছাড়া বাস্তবসম্মত পজিটিভ অ্যাফার্মেশন, কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT)-এর মাধ্যমে নেতিবাচক চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং সহায়ক সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলাও নেগেটিভিটি বায়াস কমাতে কার্যকর।

আরও একটি আকর্ষণীয় কৌশল হলো নেগেটিভ ভিজ্যুয়ালাইজেশন। অর্থাৎ সাময়িকভাবে কল্পনা করা, যদি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভালো জিনিসগুলো না থাকত তবে কেমন হতো। এই অনুশীলন বর্তমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা বাড়াতে সাহায্য করে। মোটকথা নেগেটিভিটি বায়াস মানুষের স্বাভাবিক মানসিক বৈশিষ্ট্য হলেও সচেতন অভ্যাস, ইতিবাচক সম্পর্ক এবং মানসিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এর প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এতে মানুষ নেতিবাচক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একই সঙ্গে জীবনের ইতিবাচক দিকগুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে শেখে।

সূত্র: Negativity Bias – Why Bad News Sticks And How To Balance It

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 + one =