নেপালের ভয়াবহ হড়পা বান 

নেপালের ভয়াবহ হড়পা বান 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩১ আগষ্ট, ২০২৬

নেপালের রসুয়া জেলায় ২৬ আগস্ট সকালে আছড়ে পড়ে ভয়াবহ এক হড়পা বান। এটা কি কোনও উচ্চ পার্বত্য এলাকা থেকে নেমে আসা বরফ-পাথরের ধসের কারণে তৈরি হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট এবং নেপাল ও চিনের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলির গবেষকরা ইতিমধ্যেই ঘটনার বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ শুরু করেছেন। প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভিডিও ফুটেজ এবং ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া তথ্য দেখে মনে হচ্ছে, বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথরের ধ্বংসাবশেষ লেংদে খোলা নদীতে এসে পড়ে থাকতে পারে। এই নদীটি ভোতে কোশি নদীর একটি উপনদী। বিপুল পরিমাণ বরফ-পাথর নদীতে ঢুকে পড়লে অল্প সময়ের মধ্যে জল, পলি ও বড় বড় পাথর নিয়ে একটি শক্তিশালী স্রোত তৈরি হতে পারে। সেটিই সম্ভবত নীচের দিকে হড়পা বান হিসেবে ছুটে যায়। এরপর সকালেই ভোতে কোশি অববাহিকায় জলের স্তর দ্রুত বাড়তে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে নদীর জল তীর ছাপিয়ে যায়। ভোতে কোশি নদী বরাবর সেই প্রবল স্রোত নেমে আসে ত্রিশূলী নদীতে। এর প্রভাব রসুয়া ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ভাবা হচ্ছে। বন্যার অন্যতম ভয়াবহ দিক ছিল জলের অস্বাভাবিক দ্রুত বৃদ্ধি। তথ্য অনুযায়ী, গালছিতে ত্রিশূলী নদীর জলস্তর মাত্র ৩০ মিনিটে প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়। একই সময়ে মালেখুতে জলস্তর বাড়ে প্রায় ৭ মিটার। এত দ্রুত জলস্তর বেড়ে যাওয়া থেকেই বন্যার ঢেউয়ের অস্বাভাবিক শক্তি ও গতি সম্পর্কে ধারণা করা যায়। বন্যার তীব্রতায় ত্রিশূলী নদীর একাধিক জলস্তর পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা জলের তোড়ে ভেসে যায়। তবে গালছির পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটি এখনও কাজ করছে। আরও একটি আশঙ্কার বিষয় খতিয়ে দেখছেন বিজ্ঞানীরা। নদীর কোনও সংকীর্ণ অংশে ধসের ধ্বংসাবশেষ জমে সাময়িকভাবে নদীর পথ আটকে ‘ল্যান্ডস্লাইড ড্যাম’ বা ভূমিধস বাঁধ তৈরি হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। এমন বাঁধের পিছনে জল জমে থাকতে পারে। বাঁধটি হঠাৎ ভেঙে গেলে সেই জল আরও বড় বন্যার ঢেউ তৈরি করতে পারে। ফলে নদীর উজানে কোনও বাধা তৈরি হয়েছে কি না, হলে সেটি কতটা বড় এবং কতটা স্থিতিশীল, এসবই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ঘটনার সময়ের ভূকম্পন সংক্রান্ত তথ্যও বিজ্ঞানীদের গোচরে এসেছে। চিনের জিলং এলাকার একটি সিসমোমিটার, ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে কিছু অস্বাভাবিক সংকেত রেকর্ড করেছে। চিনের ঝাংমু এলাকার আরও একটি স্টেশনেও অস্বাভাবিক কম্পন ধরা পড়েছে। সংকেতগুলির সঙ্গে সম্ভাব্য বরফ-পাথর ধসের কোনও সম্পর্ক আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এখনও ভূকম্পন এবং বন্যার মধ্যে কোনও সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক প্রমাণিত হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই একই এলাকা গত বছরও রসুয়ার ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এবার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এমনকি উজানে কোনও বাধা এখনও আটকে থাকলে তা ভেঙে দ্বিতীয় দফায় বন্যা আসার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে হিমবাহ, তুষার, পারমাফ্রস্ট ও পাহাড়ের ঢালে দ্রুত পরিবর্তনের কারণে হিন্দুকুশ হিমালয়ে অতিশীতল মণ্ডল বা ক্রায়োস্ফিয়ার সম্পর্কিত বিপদ বাড়ছে। তবে এই বন্যায় জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা কতটা, তা এখনও স্পষ্ট নয়। জলস্তর, ভূকম্পন, উপগ্রহচিত্র ও ঘটনাস্থলের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিপর্যয়ের কারণ ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বোঝার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা।

 

সূত্র: Down to Earth;August;2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one + 13 =