“নোবেলজয়ীদের শিক্ষক” আর্নল্ড সামারফেল্ড

“নোবেলজয়ীদের শিক্ষক” আর্নল্ড সামারফেল্ড

সুপর্ণা চট্টোপাধ্যায়
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ২৫ জুলাই, ২০২৬

কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে আর্নল্ড সামারফেল্ডের নাম অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। অথচ আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের বিকাশে তাঁর অবদান ছিল অসাধারণ। তিনি নিজে নোবেল পুরস্কার না পেলেও তাঁর ছাত্রদের মধ্য থেকেই উঠে এসেছেন একাধিক নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী। ফলে অনেকের মতে, কোয়ান্টাম বিপ্লবের নেপথ্য নায়কদের অন্যতম হলেন এই জার্মান তাত্ত্বিক পদার্থবিদ।

১৯১৬ সালে আর্নল্ড সোমারফেল্ড (১৮৬৮-১৮৫১) ডেনমার্কের পদার্থবিদ নিলস বোরের পরমাণু মডেলকে আরও উন্নত করেন। বোরের মডেলে ইলেকট্রনকে পরমাণুর কেন্দ্রের চারদিকে বৃত্তাকার কক্ষপথে ঘুরতে দেখানো হয়েছিল। সোমারফেল্ড সেই ধারণাকে সম্প্রসারিত করে উপবৃত্তাকার কক্ষপথের প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে তিনি আলবার্ট আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রয়োগ করে ইলেকট্রনের গতিবিধির আরও সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা দেন। ফলে এমন একটি সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়, যা বোরের মডেল ব্যাখ্যা করতে পারেনি। পরমাণুর বর্ণালিতে দেখা যাওয়া সূক্ষ্ম বিভাজন বা ফাইন স্ট্রাকচার স্প্লিটিং-এর কারণ ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয় সোমারফেল্ডের সংশোধিত মডেল। এই গবেষণার মাধ্যমেই পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধ্রুবক ফাইন স্ট্রাকচার কনস্ট্যান্ট (α বা আলফা)-এর ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মান প্রায় ১/১৩৭। এটি একটি মাত্রাহীন ধ্রুবক, যা আলোর বেগ, প্ল্যাঙ্ক ধ্রুবক এবং ইলেকট্রনের বৈদ্যুতিক আধানকে একত্রিত করে তড়িৎচৌম্বকীয় বলের শক্তি নির্ধারণ করে। এই ধ্রুবকের সুনির্দিষ্ট মান কেন এমন, সেই প্রশ্ন এখনও পদার্থবিদদের ভাবিয়ে চলেছে।

তবে গবেষণার চেয়েও সামারফেল্ডের বড় অবদান সম্ভবত তাঁর শিক্ষকতায়। জার্মানির মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে তিনি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের এমন একটি গবেষণা-বিদ্যালয় গড়ে তুলেছিলেন, যেখান থেকে পরবর্তীকালে একের পর এক বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী বেরিয়ে আসেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন ভের্নার হাইজেনবার্গ, ভলফগ্যাং পাউলি, পিটার ডিবাই এবং হ্যান্স বেথে। এঁরা সবাই পরবর্তীকালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া রসায়নে নোবেলজয়ী লাইনাস পলিংও তাঁর কাছে পড়াশোনা করেছিলেন। এই কারণেই অনেক ইতিহাসবিদ সোমারফেল্ডকে “নোবেলজয়ীদের শিক্ষক” বলেও উল্লেখ করেন।

১৯১৯ সালে জার্মান ভাষায় প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত বই ‘অ্যাটমবাউ উন্ড স্পেকট্রাললাইনিয়েন’ ১৯২০-এর দশকে পরমাণুর গঠন ও বর্ণালি তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থে পরিণত হয়। কোয়ান্টাম তত্ত্ব যত দ্রুত বিকশিত হয়েছে, বইটির প্রতিটি নতুন সংস্করণেও সেই পরিবর্তনগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে এটি দীর্ঘদিন গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এতসব অবদান সত্ত্বেও সোমারফেল্ড নোবেল পুরস্কার পাননি। বরং নোবেল না-পাওয়া পদার্থবিদদের মধ্যে সর্বাধিকবার মনোনয়ন পাওয়ার রেকর্ড আজও তাঁর দখলে। বিষয়টি নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে অন্যতম বিস্ময়কর ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

১৯৫১ সালে মিউনিখে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। আর্নল্ড সোমারফেল্ডের জীবন বিজ্ঞানজগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়, মৌলিক আবিষ্কার কিংবা অসাধারণ শিক্ষকতা সব সময় ব্যক্তিগত স্বীকৃতি এনে দেয় না। তবু একজন বিজ্ঞানীর কাজ তাঁর ছাত্র, সহকর্মী এবং পরবর্তী প্রজন্মের গবেষণার মধ্য দিয়ে যুগের পর যুগ প্রভাব বিস্তার করতে পারে। সেই অর্থে, সোমারফেল্ডের অবদান আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে আজও সমানভাবে অমলিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 + 1 =