চলতি বছরের সেপ্টেম্বরেই মহাকাশে যাত্রা শুরু করতে পারে নাসার নতুন প্রজন্মের শক্তিশালী মহাকাশ দূরবীন। প্রায় ৪০০ কোটি ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই দূরবীনের নাম রাখা হয়েছে ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ। বর্তমানে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারে উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই দূরবীন হবে বিখ্যাত হাবল স্পেস টেলিস্কোপের উত্তরসূরি। তবে এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। ন্যান্সি রোমান টেলিস্কোপ একসঙ্গে আকাশের এমন বিস্তৃত এলাকা দেখতে পারবে, যা হাবলের তুলনায় অন্তত ১০০ গুণ বেশি। পাশাপাশি এতে এমন বিশেষ প্রযুক্তি রয়েছে, যা নক্ষত্রের উজ্জ্বল আলো আড়াল করে তাদের চারপাশে ঘুরতে থাকা গ্রহ এবং গ্রহ-গঠনের চাকতি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে সাহায্য করবে। এই দূরবীনের নামকরণ করা হয়েছে ন্যান্সি গ্রেস রোমানের সম্মানে। তাঁকে অনেকেই “হাবলের জননী” বলে অভিহিত করেন। কারণ মহাকাশভিত্তিক জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণাকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ন্যান্সির মহাকাশবিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন শুরু হয়েছিল খুব অল্প বয়সেই। ১৯২৫ সালে তাঁর জন্ম। বাবা ছিলেন একজন ভূ-পদার্থবিদ, মা সংগীত শিক্ষক। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করবেন। নিজের লক্ষ্য পূরণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সোয়ার্থমোর কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৬ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচ ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর উইসকনসিনের ইয়ের্কস মানমন্দিরে গবেষণা শুরু করেন। তাঁর গবেষণাকর্ম এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে ১৯৫০ সালে প্রকাশিত তাঁর কয়েকটি গবেষণাপত্র সে সময়ের সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের মধ্যে স্থান পায়। পরবর্তীতে তিনি রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানের দিকেও কাজের পরিধি বাড়ান। ১৯৫৯ সালে নাসায় যোগ দেওয়ার পর তাঁর কর্মজীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। নাসার ইতিহাসে ন্যান্সিই প্রথম নারী যিনি একটি উচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন স্পেস সায়েন্স অফিসের প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তাঁর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় মহাজাগতিক এক্স-রে ও গামা-রে পর্যবেক্ষণকারী উপগ্রহ প্রকল্প। এছাড়া জেমিনি ও অ্যাপোলো কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাও তাঁর দায়িত্বের আওতায় ছিল। পরবর্তীতে তিনি নাসার বায়ুবাহিত জ্যোতির্বিজ্ঞান কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন। সেই কর্মসূচির মাধ্যমে বিমানভিত্তিক টেলিস্কোপ ব্যবহার করে মহাকাশ পর্যবেক্ষণের যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, তা-ই ধীরে ধীরে হাবল স্পেস টেলিস্কোপের মতো যুগান্তকারী প্রকল্পের পথ তৈরি করে। নতুন এই ন্যান্সি রোমান স্পেস টেলিস্কোপের মূল লক্ষ্য হবে মহাবিশ্বের বড় বড় রহস্য উন্মোচন করা। এটি ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি সম্পর্কে নতুন তথ্য সংগ্রহ করবে। একই সঙ্গে দূরবর্তী গ্যালাক্সি ও মহাজাগতিক কাঠামোর বিস্তৃত মানচিত্র তৈরি করবে, যা বর্তমান প্রযুক্তির তুলনায় অনেক দ্রুত করা সম্ভব হবে। তাছাড়া এর বিশেষ স্টারলাইট-ব্লকিং যন্ত্র অন্য নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণকারী গ্রহগুলোকে সরাসরি দেখার সুযোগ তৈরি করবে। ফলে পৃথিবীর বাইরের সম্ভাব্য বাসযোগ্য জগতের সন্ধানে নতুন দিগন্ত খুলে যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই টেলিস্কোপ শুধু মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বাড়াবে না, বরং ন্যান্সি গ্রেস রোমানের অসাধারণ অবদানকেও নতুন প্রজন্মের কাছে স্মরণীয় করে রাখবে।
সূত্র: Nautilus Magazine ; June ; 2026
