পক্ষাঘাতের চিকিৎসায় আশার আলো

পক্ষাঘাতের চিকিৎসায় আশার আলো

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৯ মে, ২০২৬

মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত থেকে অনেক সময় আজীবনের পক্ষাঘাত হয়। কারণ আঘাতে মস্তিষ্ক থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে সংকেত পাঠানোর স্নায়ুপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। এই ক্ষতি পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন। তবে এবার সেই দিকেই আশার আলো দেখালেন জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব কোলোন-এর বিজ্ঞানীরা। গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন ডিটমার ফিশার। তাঁর দল “হাইপার-ইন্টারলিউকিন-৬’’ বা hIL-6 নামে একটি বিশেষ প্রোটিন ব্যবহার করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত ইঁদুরের চলাফেরা অনেকটাই ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। গবেষকেরা ভাইরাস-ভিত্তিক একটি ভেক্টরের সাহায্যে এই প্রোটিন মস্তিষ্কের মোটর কর্টেক্সে পৌঁছে দেন, যে অংশ শরীরের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে। সেখান থেকে hIL-6 স্নায়ুপথ ধরে ব্রেনস্টেমে পৌঁছে বিশেষ ধরনের সেরোটোনিন-নির্ভর স্নায়ুকোষকে সক্রিয় করে। ব্রেন স্টেমের কাজ হল মস্তিষ্কের সঙ্গে শিরদাঁড়ার সংযোগ রাখা। এই স্নায়ুকোষগুলো হাঁটার ছন্দ ও সমন্বয় বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই গবেষণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল, এতে নতুন স্নায়ু তৈরি হয়নি। বরং শরীরে আগে থেকেই অক্ষত থাকা স্নায়ুগুলিই নতুন শাখা তৈরি করে বিকল্প পথ বানিয়েছে। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন “সার্কিট প্লাস্টিসিটি’’। সহজ ভাষায়, ভেঙে যাওয়া মূল রাস্তা মেরামত না করে মস্তিষ্ক ঘুরপথে সংকেত পাঠানোর উপায় খুঁজে নিয়েছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, hIL-6 চিকিৎসা পাওয়া ইঁদুরগুলি পক্ষাঘাতের পরেও অনেক ভালোভাবে হাঁটতে পেরেছে। শুধু হাঁটাই নয়, তাদের চলাফেরার সমন্বয়ও ফিরে এসেছে। অন্যদিকে চিকিৎসা না পাওয়া ইঁদুরদের মধ্যে এমন উন্নতি দেখা যায়নি। গবেষকেরা আরও দেখেছেন, ব্রেনস্টেমের সেরোটোনিন-নির্ভর স্নায়ুকোষ সরিয়ে দিলে এই উন্নতি প্রায় পুরোপুরি হারিয়ে যায়। অর্থাৎ, পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে এই স্নায়ুপথগুলিই মূল ভূমিকা পালন করছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই চিকিৎসা আঘাতের ক্ষত ছোট করেনি বা মৃত স্নায়ুকোষ ফিরিয়ে আনেনি। বরং বিদ্যমান স্নায়ু নেটওয়ার্ককে নতুনভাবে কাজে লাগিয়ে শরীরকে আবার চলাফেরা করতে সাহায্য করেছে। এই ফলাফল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। তবু গবেষকেরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, মানুষের ক্ষেত্রে এই চিকিৎসা প্রয়োগ করতে এখনও সময় লাগবে। নিরাপত্তা, সঠিক ডোজ এবং সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন। তবে তাঁদের আশা, ভবিষ্যতে মেরুদণ্ডের রজ্জুতে আঘাতের চিকিৎসায় এই পদ্ধতি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

সূত্র: DOI:10.1016/j.nbd.2026.107399

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × three =