কোনো কঠিন পৃষ্ঠতলের ওপর তরলে ভাসমান পরমাণু কীভাবে এসে বসে, জোট বাঁধে বা ছড়িয়ে থাকে—এই প্রক্রিয়াগুলোই উন্নত ব্যাটারি, ফুয়েল সেল, সেন্সর ও অনুঘটকের কার্যকারিতা নির্ধারণ করে। এতদিন বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাগুলো সরাসরি দেখতে পারতেন না। কারণ পরমাণু দেখার অন্যতম শক্তিশালী প্রযুক্তি ট্রান্সমিশন ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি (TEM) কাজ করে শূন্যস্থানে, যেখানে তরল পরিবেশে চলমান রাসায়নিক প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন। এইবার সেই সীমাবদ্ধতা ভেঙে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার-এর গবেষকেরা। তারা এমন এক ‘স্বাভাবিক’ ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি পদ্ধতি তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে তরলের ভেতরেই কঠিন পৃষ্ঠতলে পরমাণুর অধিশোষণ সরাসরি দেখা সম্ভব। গবেষণার নেতৃত্ব দেন খ্যাতনামা বিজ্ঞানী সারা হেইগ। বিজ্ঞানীরা গ্রাফিনের দুই পাতলা স্তরের মাঝে তরল আটকে ফেলে ক্ষুদ্র কোষ তৈরি করেন। আগের পদ্ধতিতে এসব কোষ বন্ধ করতে আঠা ব্যবহার করতে হতো, ফলে দূষণ তৈরি হতো এবং দ্রাবক বাষ্পীভূত হয়ে ঘনত্ব বদলে যেত। নতুন কৌশলে গবেষকেরা পুরো প্রক্রিয়াটি তরলের ভেতরেই সম্পন্ন করেন। একটি সিলিকন নাইট্রাইড ক্যান্টিলিভার ব্যবহার করে গ্রাফিন স্তর দিয়ে কোষ সিল করা হয়, যা পরে আঠা-লাগানো নোটপত্র খোলার মতো করে সরিয়ে নেওয়া যায়। এতে নমুনা থাকে অনেক বেশি বিশুদ্ধ ও স্থিতিশীল।ক্যান্টিলিভার হল এমন একটি গঠন যা এক প্রান্তে স্থির বা সংযুক্ত থাকে এবং অন্য প্রান্তটি কোনো অবলম্বন ছাড়াই শূন্যে প্রসারিত থাকে।
এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে দলটি পরীক্ষা করে দেখেছেন পাঁচ ধরনের দ্রাবক—অ্যাসিটোন, ইথানল, জল, বিউটানল ও সাইক্লোহেক্সানোন সোনার পরমাণুর আচরণ বদলে দেয়। গবেষকেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ১০ লক্ষেরও বেশি সোনার পরমাণুর অবস্থান বিশ্লেষণ করেন। ফল ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অ্যাসিটোনে সোনার পরমাণুগুলো বেশিরভাগই আলাদা আলাদা অবস্থায় ছিল। গবেষকদের মতে, অ্যাসিটোনের মেরুমুখী হওয়ার প্রবণতা কম, তাই তা সোনার আয়নগুলোর মধ্যে বিকর্ষণ বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে জল ও সাইক্লোহেক্সানোনের মতো অতি মেরুধর্মী দ্রাবকে সোনার পরমাণুগুলো একত্রিত হয়ে বড় ন্যানোকণায় রূপ নেয়।
এর অর্থ, শুধু দ্রাবক বদলেই কোনো পৃষ্ঠতলে পরমাণুর বিন্যাস ও ন্যানোকণার গঠন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। শিল্পক্ষেত্রে এটি বিশাল সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। কারণ উন্নত অনুঘটক তৈরিতে পরমাণুর বিন্যাসই বিক্রিয়ার গতি ও দক্ষতা নির্ধারণ করে। একইভাবে ব্যাটারি ইলেকট্রোড বা ফুয়েল সেলের পৃষ্ঠতলেও এমন নিয়ন্ত্রণের মূল্য খুব বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একটি নতুন যন্ত্রগত সাফল্য নয়, এ আসলে কঠিন পদার্থ আর তরল পদার্থের সংযোগতলে বিজ্ঞানকে সরাসরি দৃশ্যমান করার যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা যদি এই প্রযুক্তি দিয়ে চলমান রাসায়নিক বিক্রিয়াও দেখতে পান, তবে শক্তি-প্রযুক্তি ও ন্যানো-মেটিরিয়াল গবেষণায় এক নতুন অধ্যায়ের শুভারম্ভ হবে।
সূত্র:S Sullivan-Allsop et al, Science, 2026, DOI: 10.1126/science.adw2469
