পুরুষশাসিত বিজ্ঞানজগতে অপরাজিতা লরা মারিয়া কাতেরিনা বাসি

পুরুষশাসিত বিজ্ঞানজগতে অপরাজিতা লরা মারিয়া কাতেরিনা বাসি

সুপর্ণা চট্টোপাধ্যায়
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ৬ নভেম্বর, ২০২৬

১৭৩২ সাল। ইতালির বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন সমবেত হয়েছেন বিদ্বজ্জন, অধ্যাপক ও পণ্ডিতেরা। তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে একের পর এক পদার্থবিদ্যা ও গণিতের মোট ৪৯টি বিষয়ে বিতর্কে অংশ নিলেন ২১ বছরের এক তরুণী। প্রতিটি বিতর্কেই তাঁর যুক্তি ছিল অপ্রতিরোধ্য। তিনি লরা মারিয়া কাতেরিনা বাসি (১৭১১-১৭৭৮)

 

আঠারো শতকের ইউরোপে বিজ্ঞানচর্চা ছিল মূলত পুরুষদের দখলে। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে বাসির এই সাফল্য ছিল কার্যত নজিরবিহীন। তাঁর মেধায় মুগ্ধ হয়ে একই বছর বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডক্টরেট ডিগ্রি দেয়, বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির সদস্য করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার দায়িত্বও দেয়। এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদে নিযুক্ত বিশ্বের প্রথম নারীদের অন্যতম পথিকৃৎ এবং বেতনভুক্ত নারী অধ্যাপকদের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম।

 

কিন্তু স্বীকৃতি পাওয়া আর সমান অধিকার পাওয়া যে এক কথা নয়, বাসির জীবন তারই প্রমাণ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার দায়িত্ব পেলেও পুরুষ সহকর্মীদের মতো অবাধে পড়ানোর সুযোগ পাননি বাসি। প্রকাশ্যে বক্তৃতা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ছিল নানা বিধিনিষেধ। তাঁর যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ করার সুযোগ না থাকলেও, নারী হওয়ার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমাবদ্ধতার বাইরে নিজের বাড়িতেই গড়ে তোলেন ব্যক্তিগত পরীক্ষাগার। সেখানে চলত বিজ্ঞানচর্চা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পড়াশোনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা যখন তাঁর জন্য পুরোপুরি খুলছিল না, তখন নিজের বাড়িকেই কার্যত বিজ্ঞানশিক্ষার বিকল্প কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন তিনি।

 

বাসির খ্যাতি অবশ্য বোলোনিয়ার গণ্ডিতে আটকে থাকেনি। ইউরোপ ভ্রমণে আসা বহু পণ্ডিত ও বিজ্ঞানীর কাছে তাঁর বক্তৃতা শোনা হয়ে উঠেছিল বিশেষ আকর্ষণ। আইজ্যাক নিউটনের তত্ত্ব ও চিন্তাধারা ইতালিতে পরিচিত করে তোলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বাসির। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন সময়ের তুলনায় ব্যতিক্রমী। বিজ্ঞানী জিউসেপ্পে ভেরাত্তিকে বিয়ে করার পর দু’জনে একসঙ্গে বিজ্ঞানচর্চা চালিয়ে যান। ভেরাত্তি পরবর্তী সময়ে বাসির শিক্ষণকাজে সহকারী হিসেবেও যুক্ত হন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাসি অধ্যাপনার কাজ করেছেন, গবেষণা চালিয়েছেন এবং বিজ্ঞানশিক্ষায় অবদান রেখেছেন। অথচ তাঁর দায়িত্ব ও যোগ্যতার সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির ব্যবধান রয়ে গিয়েছিল।

 

১৭৭৬ সালে, ৬৫ বছর বয়সে, অবশেষে বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষাভিত্তিক পদার্থবিদ্যার আনুষ্ঠানিক অধ্যাপক পদ পান বাসি। এই নিয়োগের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ বেতনপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদদের মধ্যে স্থান করে নেন তিনি। এর মাত্র দু’বছর পরে, ১৭৭৮ সালে, তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু তার আগেই কয়েক দশকের নিরলস কাজ দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, বিজ্ঞানচর্চায় নারীর যোগ্যতা কোনো অংশেই কম নয়।

 

লরা বাসির কাহিনি শুধু একজন প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর সাফল্যের গল্প নয়। এটি এমন এক নারীর ইতিহাস, যিনি স্বীকৃতি পাওয়ার পরেও সমান সুযোগের জন্য লড়াই করে গিয়েছেন। যে জগতে নারীদের জন্য জায়গা প্রায় ছিলই না, সেখানে নিজের মেধা, যুক্তি ও অধ্যবসায় দিয়ে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি।

 

সূত্র: University of Bologna archives, Accademia delle Scienze di Bologna records, Dictionary of Scientific Biography

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × three =