গত ২৩ জুলাই রসায়ন বিজ্ঞানের অন্যতম প্রভাবশালী তাত্ত্বিক বিজ্ঞানী, ১৯৯২ সালের নোবেলজয়ী রুডলফ (রুডি) এ. মার্কাসের সদ্য প্রয়াণ ঘটেছে। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্তও এই শতবর্ষ অতিক্রান্ত বিজ্ঞানী গবেষণায় সক্রিয় ছিলেন। তিনটি গবেষণাপত্র নিয়ে কাজ করছিলেন। প্রায় আট দশকের দীর্ঘ গবেষণা জীবনে তিনি প্রকাশ করেছেন ৫০০-রও বেশি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ। বিজ্ঞানচর্চার প্রতি তাঁর এই আজীবন নিবেদন তাঁকে আধুনিক রসায়নের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
রুডলফ মার্কাসের জন্ম ১৯২৩ সালের ২১ জুলাই কানাডার মন্ট্রিয়লে। ছোটবেলা থেকেই গণিত ও বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। তিনি ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৩ সালে রসায়নে স্নাতক এবং ১৯৪৬ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনের শুরুতে পরীক্ষামূলক গবেষণায় যুক্ত থাকলেও পরে গণিতের প্রতি গভীর আকর্ষণ তাঁকে তাত্ত্বিক রসায়নের দিকে নিয়ে যায়। পরে তিনি নিজেই বলেছিলেন, পরীক্ষাগার ছেড়ে তত্ত্বভিত্তিক গবেষণায় আসা তাঁর জীবনে যেন “এক নতুন প্রাণের সঞ্চার” ঘটিয়েছিল।
১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি, যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকলিন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে কাজ করার সময় তিনি এমন একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করেন, যা দীর্ঘদিন ধরে রসায়নবিদদের ভাবিয়ে তুলেছিল। কেন কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ইলেকট্রন অত্যন্ত দ্রুত স্থানান্তরিত হয়, অথচ অন্য ক্ষেত্রে একই প্রক্রিয়া অনেক ধীরগতির হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি দেখান, এক অণু থেকে অন্য অণুতে ইলেকট্রন যাওয়ার আগে আশপাশের পরমাণু ও দ্রাবক অণুগুলিকে একটি নির্দিষ্ট বিন্যাসে পুনর্বিন্যস্ত হতে হয়। এই পুনর্বিন্যাসে যে শক্তির প্রয়োজন হয়, তার নাম তিনি দেন ‘রি-অর্গানাইজেশন এনার্জি’। এই ধারণার ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে বিশ্ববিখ্যাত ‘মার্কাস তত্ত্ব’।
পরবর্তীকালে তাঁর তত্ত্ব আরও একটি যুগান্তকারী ধারণা উপস্থাপন করে, যা ‘মার্কাস ইনভার্টেড ইফেক্ট’ নামে পরিচিত। এতে বলা হয়, কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ার চালিকা শক্তি বাড়লেও সব সময় বিক্রিয়ার গতি বাড়বে না; বরং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তা উলটে কমেও যেতে পারে। প্রথমদিকে এই ধারণা অনেক বিজ্ঞানীর কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। কিন্তু ১৯৮৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে এর সত্যতা প্রমাণিত হলে মার্কাসের তত্ত্ব নতুন মর্যাদা লাভ করে। আজ এই তত্ত্ব শুধু রসায়নের পাঠ্যবইয়ের অংশ নয়, বরং মরচে ধরা, উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষ, জৈবরাসায়নিক বিক্রিয়া, জ্বালানি প্রযুক্তি, অনুঘটক, ন্যানোবিজ্ঞান এবং আধুনিক ইলেকট্রনিক্স গবেষণার অন্যতম ভিত্তি।
ইলেকট্রন স্থানান্তর নিয়ে তিন দশকেরও বেশি সময়ের নিরলস গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯২ সালে তিনি রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি তাঁর তত্ত্বকে রসায়নের বিভিন্ন শাখাকে সমন্বিতভাবে বোঝার এক ঐক্যবদ্ধ ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে এর আগে ১৯৮৯ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ‘মেডেল অব সায়েন্স’ লাভ করেন। এছাড়া ‘উলফ’ পুরস্কার, ‘আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি’র একাধিক সম্মাননাসহ বিশ্বের বহু মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনি ‘ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস’, ‘রয়্যাল সোসাইটি’ সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন।
১৯৭৮ সালে মার্কাস যোগ দেন ক্যালটেক (ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি)-এ। সেখানেই তিনি জীবনের বাকি সময় কাটান গবেষণা, শিক্ষকতা এবং নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের গড়ে তোলার কাজে। ২০২৪ সালে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিষ্ঠিত হয় রুডলফ এ. মার্কাস সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল কেমিস্ট্রি।
ক্যালটেকের সভাপতি রে জয়বর্ধনে তাঁর মৃত্যুতে বলেন, “মার্কাস এমন একজন দূরদর্শী বিজ্ঞানী ছিলেন, যিনি রাসায়নিক বিক্রিয়ার সবচেয়ে মৌলিক নীতিগুলিকে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর গবেষণা পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, অনুঘটক, ইলেকট্রনিক্সসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আধুনিক গবেষণার ভিত্তি তৈরি করেছে।” তাঁর সহকর্মীদের মতে, শতবর্ষ পেরিয়েও বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর কৌতূহল একটুও কমেনি। নতুন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগ্রহ তাঁকে শেষ দিন পর্যন্ত গবেষণাগারে ধরে রেখেছিল।
রুডলফ এ. মার্কাস শুধু একজন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী নন; তিনি এমন একজন চিন্তাবিদ, যিনি ইলেকট্রনের অদৃশ্য যাত্রাপথের মধ্যেই প্রকৃতির গভীর নিয়মের সন্ধান দিয়েছেন। তাঁর তত্ত্ব আজও আধুনিক রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের গবেষণায় সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, আর তাঁর অবদান বিজ্ঞান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সূত্র: Caltech; July ; 2026
