প্রয়াত সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং-এর পুরোধা মার্গারেট হ্যামিল্টন

প্রয়াত সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং-এর পুরোধা মার্গারেট হ্যামিল্টন

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

চাঁদে মানুষ পাঠানোর ইতিহাসে তাঁর নাম হয়তো নীল আর্মস্ট্রংয়ের সঙ্গে সমান তালে উচ্চারিত হয় না। কিন্তু মার্গারেট হ্যামিল্টনের সফটওয়্যারই ছিল অ্যাপোলো অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভরসা। গত ৩০ সেপ্টেম্বর, ৯০ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন কিংবদন্তি কম্পিউটার বিজ্ঞানী মার্গারেট। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি-র ইন্সট্রুমেন্টেশন ল্যাবে নাসা-র অ্যাপোলো কর্মসূচির সফটওয়্যার টিমের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হ্যামিল্টন। তাঁর হাত ধরেই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং আলাদা একটি পেশাগত শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করে। তিনি ১৩০টিরও বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। অ্যাপোলো মিশনে হ্যামিল্টনের অন্যতম বড় অবদান ছিল ‘ত্রুটি-প্রতিরোধী প্রোগ্রামিং’। সফটওয়্যারকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে তা মানুষের ভুল বা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিও সামলে নিতে পারে। একবার তাঁর চার বছরের মেয়ে লরেন ভুল করে অ্যাপোলো সিমুলেটরে এমন একটি প্রোগ্রাম চালিয়ে দেয়, যার ফলে সিস্টেম ক্র্যাশ করে। হ্যামিল্টন সতর্ক করেছিলেন, মহাকাশযানে এমন ভুল হলে কিন্তু বিপদ হতে পারে। প্রথমে তাঁর প্রস্তাব খারিজ হয়ে গেলেও, অ্যাপোলো-৮ মিশনে ঠিক সেই ভুলটাই ঘটেছিল। পরে তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী সফটওয়্যারে পরিবর্তন আনা হয়। অন্যদিকে অ্যাপোলো-১১-এ চাঁদে নামার ঠিক আগে কম্পিউটারে ভেসে ওঠে ‘১২০২’ অ্যালার্ম। যার অর্থ কম্পিউটার প্রায় অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রয়েছে। হ্যামিল্টন ও তাঁর দলের তৈরি সফটওয়্যার তৎক্ষণাৎ জরুরি কাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে অপ্রয়োজনীয় কাজ বন্ধ করে দেন। ফলে সিস্টেম গুরুত্বপূর্ণ কাজটা চালিয়ে যায়। এক্ষেত্রে অ্যালার্ম থামেনি, তবে তাঁর সফটওয়্যার জানত কোন কাজটা আগে করতে হবে। শেষ পর্যন্ত ‘ইগল’ চাঁদে নামে। মানুষ প্রথমবার পা রাখে চাঁদের মাটিতে।

 

১৯৩৬ সালে ইন্ডিয়ানার পাওলিতে জন্ম হ্যামিল্টনের। ১৯৫৯ সালে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি-তে কাজ শুরু করেন। আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সফটওয়্যার দিয়ে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে তাঁর প্রবেশ। পরে এমআইটি লিঙ্কন ল্যাবরেটরি-র ‘সেজ’ প্রকল্পে কাজ করেন। ১৯৬৫ সালে অ্যাপোলোতে যোগ দেন। তিনিই ছিলেন প্রকল্পের প্রথম প্রোগ্রামার এবং প্রথম মহিলা প্রোগ্রামারদের একজন। পরে সফটওয়্যার টিমের নেতৃত্বে উঠে আসেন। অ্যাপোলো-পরবর্তী সময়েও তিনি থামেননি। ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন হাই অর্ডার সফটওয়্যার, পরে হ্যামিলটন টেকনোলোজিস। তাঁর লক্ষ্য ছিল একটাই, সফটওয়্যার তৈরির আগে সম্ভাব্য ভুলকে চিহ্নিত করা এবং সিস্টেমকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তোলা।

 

২০১৬ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁকে দেন স্বাধীনতার রাষ্ট্রপতি পদক। নাসার ‘অসাধারণ মহাকাশ অবদান’ পুরস্কার, কম্পিউটার ইতিহাস সংগ্রহশালার ফেলো সম্মান-সহ পেয়েছেন আরও বহু স্বীকৃতি। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হল একটি ধারণা- সফটওয়্যারও ইঞ্জিনিয়ারিংয়েরই একটি শাখা। একসময় এই ভাবনাটা ছিল অচেনা, পরে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং হয়ে ওঠে আধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম ভিত্তি। অ্যাপোলো অভিযানের সেই ঐতিহাসিক ছবিতে হ্যামিল্টনের পাশে স্তূপ করে রাখা তাঁর দলের লেখা সফটওয়্যার কোড, যা পরে প্রযুক্তির ইতিহাসে হয়ে ওঠে এক প্রতীকী ছবি। চাঁদে পা রেখেছিলেন মহাকাশচারীরা, কিন্তু সেই পদক্ষেপকে নিরাপদ করার নেপথ্যে ছিল একদল সফটওয়্যার প্রকৌশলী, যাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন মার্গারেট হ্যামিল্টন।

সূত্র: MIT News; Department of Aeronautics and Astronautics, October , 20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − ten =