প্রোস্টেট ক্যানসার মোকাবিলায় tRNA 

প্রোস্টেট ক্যানসার মোকাবিলায় tRNA 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৩ অক্টোবর, ২০২৬

ক্যানসারকে বশে আনার ওষুধ যখন আর কাজ করে না, তখন তাকে মোকাবিলা করতে নতুন কৌশল খুঁজতে হয় বিজ্ঞানীদের। এবার সেরকমই এক কৌশলের সন্ধান মিলল কোষের প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়ায়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রেড হ্যাচিনসন ক্যানসার সেন্টারের গবেষকেরা দেখিয়েছেন, ট্রান্সফার আরএনএ-র মতো ক্ষুদ্র অণুর পরিমাণ বাড়িয়ে চিকিৎসায় প্রতিরোধী প্রোস্টেট ক্যানসার কোষকে আবার ওষুধের প্রতি সংবেদনশীল করে তোলা সম্ভব। গবেষণাটির বিবরণ ২০২৬ এর ৭ অক্টোবর বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে নেচার পত্রিকায়।

পুরুষদের অন্যতম সাধারণ ক্যানসার হল প্রোস্টেট ক্যানসার । ৫০ বছরের বা তার ঊর্ধের পুরুষদের কাছে আতঙ্কের কারণ এই ক্যান্সার। এর চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি হল অ্যান্ড্রোজেন রিসেপ্টর নামক প্রোটিনকে লক্ষ্য করে ওষুধ প্রয়োগ করা। এই প্রোটিনই ক্যানসার কোষের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ক্যানসার কোষের চরিত্র সব সময় এক থাকে না। চিকিৎসার চাপে কিছু কোষ অ্যান্ড্রোজেন রিসেপ্টরের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ফেলে। ফলে তারা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং প্রচলিত ওষুধের কার্যকারিতা কমে যায়। এই পরিবর্তনই চিকিৎসার পথে বড় বাধা।

এই বাধা অতিক্রমের উপায় খুঁজতে গিয়ে গবেষকেরা নজর দেন কোষের প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়ার দিকে। কোষে মেসেঞ্জার আরএনএ প্রোটিন তৈরির নির্দেশ বহন করে। আর tRNA সেই নির্দেশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড সরবরাহ করে প্রোটিন গঠনে সাহায্য করে। এতদিন টি আর এন এ অণুর একমাত্র পরিচয় ছিল যে, সে মূলত প্রোটিন তৈরির সহায়ক। এই গবেষণা থেকে নতুন ধারণা উঠে এল – কোষের পরিচয় ও আচরণ নিয়ন্ত্রণেও tRNA গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

গবেষকেরা প্রোস্টেট ক্যানসার কোষ, ইঁদুরের মডেল এবং রোগীদের টিউমারের নমুনা বিশ্লেষণ করে tRNA1Arg(UCU) নামের একটি বিশেষ অণুর সন্ধান পান। দেখা যায়, অ্যান্ড্রোজেন রিসেপ্টরের ওপর নির্ভরশীল ক্যানসার কোষগুলিতে এই অণুর পরিমাণ বেশি। অন্যদিকে, চিকিৎসা-প্রতিরোধী টিউমারে এর মাত্রা কম।

এরপর পরীক্ষামূলকভাবে প্রতিরোধী টিউমারে এই tRNA সরবরাহ করা হয়। তাতে টিউমার কোষের বৈশিষ্ট্য বদলে যায় এবং অ্যান্ড্রোজেন রিসেপ্টরকে লক্ষ্য করে ব্যবহৃত ওষুধের কার্যকারিতা আবার ফিরে আসে। অর্থাৎ, ক্যানসার কোষের জিনগত পরিবর্তনের বাইরেও প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে তার আচরণ বদলানো যায়।

এই গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক ইয়ন সু কিম এবং অ্যান্ড্রু হিশ-এর মতে, এ আবিষ্কার ক্যানসার জীববিজ্ঞানের এক নতুন দিক উন্মোচন করেছে। ভবিষ্যতে tRNA-কে কাজে লাগিয়ে আক্রমণাত্মক ক্যানসার শনাক্ত করা, রোগীর জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা বেছে নেওয়া কিংবা ওষুধ-প্রতিরোধ কমানোর নতুন পদ্ধতি তৈরি করা যেতে পারে। ফুসফুস ও স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রেও এই ধারণা আরও কার্যকর হবে বলে আশা করা যায়।

তবে আপাতত এই সাফল্য পরীক্ষামূলক গবেষণাতেই সীমাবদ্ধ। মানুষের চিকিৎসায় এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা প্রমাণ করতে আরও বহু পরীক্ষা প্রয়োজন। তবু একটি ক্ষুদ্র অণুর হাত ধরে ক্যানসার কোষের আচরণ বদলে দেওয়ার এই সম্ভাবনা ভবিষ্যতের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।

সূত্র: “tRNA dosage regulates lineage dependency and resistance in prostate cancer” by Yeon Soo Kim, Sonali Arora, et.al; 7th October 2026, published in Nature journal.

DOI: 10.1038/s41586-026-11153-8

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × 3 =