প্লাসেবো বিজ্ঞান ও ডাইনি খেদানো আন্দোলন

প্লাসেবো বিজ্ঞান ও ডাইনি খেদানো আন্দোলন

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ৮ মে, ২০২৬

১৬০০ শতকের ইউরোপ ছিল ভয়, ধর্মীয় উন্মাদনা এবং কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। সেই অস্থির প্রেক্ষাপটে ১৫৯৯ সালে ফ্রান্সের লোয়ার ভ্যালিতে ঘটে এক অদ্ভুত ঘটনা, যার কেন্দ্রে ছিল মার্থে ব্রসিয়ে নামের এক তরুণী। মেয়েটি হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। হঠাৎ হঠাৎ মাটিতে গড়াগড়ি খাওয়া, কিছুক্ষণ পরপর খিঁচুনি ধরা, চোখ উল্টে যাওয়া, জিভ বেরিয়ে আসা এবং এক বিকৃত কণ্ঠে কথা বলা। ১৬০০ শতকের শেষভাগে এক তরুণীর এহেন অদ্ভুত আচরণ ফ্রান্সে তুমুল আলোড়ন তোলে। তিনি দাবি করেন, তার এক প্রতিবেশী ডাকিনী বিদ্যা প্রয়োগ করে তার শরীরে দানব প্রবেশ করিয়েছে। এই দাবি করে সে দ্রুতই জনসমক্ষে আলোচিত ও বিখ্যাত হয়ে ওঠে।

তার পরিবার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাকে নিয়ে এ শহর সে শহর ঘুরতে থাকে। সেসব জায়গায় পুরোহিতদের দ্বারা নিয়মিত ঝাড়ফুঁক বা দত্যিদানো তাড়ানোর আচার অনুষ্ঠিত হতো। একটা সময়ের পর এসব আচার ধীরে ধীরে এক ধরনের জন বিনোদনে পরিণত হল। সাধারণ মানুষ ভিড় জমিয়ে সেসব অলৌকিক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করত। এদিকে সেই সময় ফ্রান্সে ক্যাথলিক ও প্রোটেস্টান্টদের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব চলছিল। ব্ৰোসিয়ে কথিত দানবটা দাবি করত যে সব প্রোটেস্টান্ট শয়তানের অনুসারী। ফলে পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠত।

 

এই ঘটনাটি কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এর একটা রাজনৈতিক গুরুত্বও ছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কায় ফ্রান্সের রাজা চতুর্থ হেনরি বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে সত্যতা যাচাই করার জন্য বিশেষ চিকিৎসক দলকে গোপনে তদন্তের নির্দেশ দেন। এই তদন্তের নেতৃত্বে ছিলেন রাজ চিকিৎসক মিশেল মারস্কট। তিনি প্রচলিত ধর্মীয় ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে এক অভিনব পদ্ধতি গ্রহণ করেন। সেটাই আধুনিক বিজ্ঞানের চোখে আজ প্লাসেবো নিয়ন্ত্রণ হিসেবে পরিচিত (রোগীকে মানসিকভাবে আশ্বস্ত করতে তাকে দেওয়া ছদ্ম চিকিৎসা) । তিনি আসল এবং নকল ধর্মীয় সামগ্রী ব্যবহার করে ব্ৰোসিয়ের প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করতে শুরু করেন। যেমন আশীর্বাদ-পূত জল ও রুটি, এবং একই ধরনের কিন্তু পূত বলে আশীর্বাদ না-করা বস্তু। উদ্দেশ্য ছিল, পবিত্র বস্তু ও ভুয়ো বস্তুর মধ্যে পার্থক্য তার আচরণে প্রতিফলিত হয় কি না।

প্রায় ৪০ দিন ধরে চলে এই পরীক্ষা। পরীক্ষায় দেখা যায়, পবিত্র হোক বা ভুয়ো, তার চিৎকারে কোনো হেরফের ঘটেনি। যা ছিল তাই থেকে গেছে প্রতিবার। মানে আসল ও নকলের মধ্যে তার প্রতিক্রিয়ায় কোনো পার্থক্য নেই। অর্থাৎ, তাকে ডাইনি ভর করেছে এমন দাবির পেছনে বাস্তব কোনো প্রমাণ নেই। এর ফলে মারেস্কো এবং তার সহকর্মীরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে ব্ৰোসিয়ের শরীরে কোনো দানব প্রবেশ করেনি। ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক বা বলা চলে একপ্রকার অভিনয়, অলৌকিক কিছু নয়। যদিও কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিপরীত মত প্রকাশ করে, তবুও এই পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে পুরো ইউরোপ জুড়ে তোলপাড় পড়ে যায়।

আজকের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আধুনিক প্লাসেবো-নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার একটি প্রাথমিক রূপ হিসেবে বিবেচিত হয়। যদিও তখন প্লাসেবো শব্দটি প্রচলিত ছিল না, তবুও এই পরীক্ষার মূল ধারণা—আসল-নকলের মধ্যে তুলনা করে সত্য যাচাই আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ভিত্তি গড়ে তোলে।

আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানী কারিন জেন্সেন এই বিষয়ে গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে প্লাসেবো ধারণার শিকড় আরও প্রাচীন, মধ্যযুগীয় চিন্তাধারায় নিহিত। তিনি এবং তার সহকর্মী রাচা কিরাকোসিয়ান বিশ্বাস করতেন যে প্লাসেবো পদ্ধতির সূচনা আধুনিক যুগের আগেই হয়েছিল। তারা মধ্যযুগীয় খ্রিস্টশাস্ত্রীয় দর্শনের সেই দিকে নজর দেন, যেখানে যুক্তি ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধানের চেষ্টা করা হতো। তখন জিয়ান গারসন একজন প্রভাবশালী ধর্মতত্ত্ববিদ সত্যতা যাচাই করতে যুক্তিনির্ভর পদ্ধতির কথা বলেছিলেন। তখন ধর্ম ও বিজ্ঞান তো আলাদা ছিল না; বরং ধর্মীয় ভাষাই ছিল বৈজ্ঞানিক চিন্তার বাহন। গারসনের লেখাগুলি ছাপাখানা আবিষ্কারের পর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ইউরোপের বিচারক ও ধর্মীয় অনুসন্ধানকারীদের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। এই লেখাগুলোর প্রভাবেই ধীরে ধীরে অলৌকিকতার ব্যাখ্যা ধর্ম থেকে সরে চিকিৎসা ও বিজ্ঞানের পরিসরে প্রবেশ করে।

 

একই পদ্ধতি পরে ব্যবহার করা হয় ভণ্ড চিকিৎসকদের মুখোশ খুলতে। যেমন ফ্রাঞ্জ অ্যান্টন মেসমার, যিনি তথাকথিত অ্যানিম্যাল ম্যাগনেটিজম দিয়ে রোগ সারানোর দাবি করেছিলেন। পরে এটি বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল প্রমাণিত হয়। প্লাসেবো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বোঝা যায় যে তার প্রভাব আসলে রোগীর বিশ্বাসের ফল, বাস্তব কোনো শারীরিক প্রভাব নয়। এই গবেষণার ফলাফল জার্নাল অফ দ্য রয়্যাল সোসাইটি অফ মেডিসিনে প্রকাশিত হয়। এর সাথে টেড জ্যাক ক্যাপচুক প্রমুখ বিশেষজ্ঞরাও যুক্ত ছিলেন। তারা দেখিয়েছেন যে মারেস্কোর পদ্ধতি আসলে গারসনের চিন্তাধারারই একটি বাস্তব প্রয়োগ।

বর্তমান যুগে প্লাসেবো নিয়ন্ত্রণ আধুনিক চিকিৎসা গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। প্রায় সব ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালেই এটি ব্যবহৃত হয়। এতে বোঝা যায় কোনো ওষুধ সত্যিই কার্যকর, নাকি কেবল মানসিক প্রভাবে রোগী ভালো বোধ করছে। এটি বিজ্ঞানীদের সাহায্য করে শরীর ও মনের পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে এবং চিকিৎসার প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ণয় করতে।

 

ডাইনিবিদ্যা ও কুসংস্কারের অন্ধকার যুগ থেকেই মানুষের যুক্তিবোধ ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে। মার্থা ব্রসিয়ের ঘটনাটি শুধু একটি ঐতিহাসিক কৌতূহলের বিষয় নয়; এটি দেখিয়ে দেয়, কীভাবে সন্দেহ, পরীক্ষা এবং যুক্তির মাধ্যমে মানবসভ্যতা সত্যের দিকে এগিয়ে চলে। আজকের আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের যে শক্তিশালী ভিত্তি রয়েছে, তার সূচনা হয়েছিল ঠিক এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই।

 

সূত্র: Placebo Science Is Rooted in Witch Hunts,How we learned to sort true from false in medicine By Kristen French, 11:32 AM GMT-5 on August 27th, 2024. Published in Journal of the Royal Society of Medicine.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

8 + eighteen =