ফলমাছির স্নায়ুকোষ-মানচিত্র 

ফলমাছির স্নায়ুকোষ-মানচিত্র 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৪ জুন, ২০২৬

বিজ্ঞানীরা এই প্রথম একটি পূর্ণবয়স্ক ফলমাছি/ Drosophila melanogaster-এর কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের প্রতিটি স্নায়ুকোষের সংযোগের সম্পূর্ণ মানচিত্র বা কনেক্টোম তৈরি করেছেন। হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল ও প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত এই গবেষণা স্নায়ুবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক। এই গবেষণাটির ফলাফল বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে নেচার পত্রিকায়।

কনেক্টোম হলো এমন একটি মানচিত্র যার মাধ্যমে বোঝা যায়, একটি স্নায়ুকোষ (নিউরন) অন্য স্নায়ুকোষের সঙ্গে কীভাবে সংযুক্ত। এর আগে বিজ্ঞানীরা ফলমাছির মস্তিষ্কের কনেক্টোম তৈরি করেছিলেন। এবার তাঁরা মস্তিষ্কের সঙ্গে শরীরের বিভিন্ন অংশ নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুরজ্জু , অর্থাৎ নার্ভ কর্ড-কেও যুক্ত করেছেন। ফলে এই প্রথম মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে সমগ্র শরীরের পুরো স্নায়ুতন্ত্রের সংযোগচিত্র/ সাইন্যাপসের চিত্র হাতে এসেছে।

এখান থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি হলো—ফলমাছির আচরণ নিয়ন্ত্রণে যে মস্তিষ্ক একাই “কমান্ড সেন্টার” হিসেবে কাজ করে না সেটা স্পষ্ট বোঝা গেল। এতদিন ধারণা ছিল যে মস্তিষ্কই সব সিদ্ধান্ত নেয় এবং শরীরের বিভিন্ন অংশকে নির্দেশ দেয়। কিন্তু নতুন এই গবেষণায় দেখা গেল, শরীরের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় স্নায়বিক সার্কিটগুলো নিজেদের মধ্যে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একটি পা নাড়ানোর জন্য প্রধানত সেই পায়ের স্থানীয় স্নায়বিক-সার্কিটই/সাইন্যাপসই দায়ী। পরে সেই সার্কিট অন্য পায়ের সার্কিটের/সাইন্যাপসের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমন্বিত হাঁটার ব্যবস্থা তৈরি করে। একই ধরনের বিকেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ ডানা, মুখ এবং অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। অর্থাৎ, আচরণ তৈরি হয় বহু স্থানীয় স্নায়ু-নেটওয়ার্কের যৌথ প্রচেষ্টায়, শুধু মস্তিষ্কের নির্দেশে নয়।

এই বিশাল মানচিত্র তৈরির জন্য বিজ্ঞানীরা একটি ফলমাছির শরীরকে হাজার হাজার অতিক্ষুদ্র পাতলা অংশে কেটে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে লক্ষ লক্ষ ছবি সংগ্রহ করেন। এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সেই ছবিগুলোকে একত্র করে একটি ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা হয়। এতে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার নিউরনের পারস্পরিক সংযোগ বিশদভাবে দেখা সম্ভব হয়েছে।

গবেষকদের মতে, এই কনেক্টোম ভবিষ্যতে স্নায়ুতন্ত্রের মৌলিক নীতিগুলো বোঝার জন্য এক অমূল্য সম্পদের সমতুল্যই হবে। মানুষের মস্তিষ্ক অনেক বেশি জটিল হলেও ফলমাছির ওপর করা বহু আবিষ্কার অতীতে স্তন্যপায়ী প্রাণী ও মানুষের ক্ষেত্রেও সত্য প্রমাণিত হয়েছে। তাই বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ফলমাছির এই বিকেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অন্য প্রাণী, এমনকি মানুষের স্নায়ুতন্ত্রেও থাকতে পারে।

এমনকি এই গবেষণা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও নতুন ধারণা দিতে পারে। একটি ক্ষুদ্র ফলমাছি যে দক্ষতার সঙ্গে চলাফেরা, শেখা ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, তা আজকের অনেক উন্নত কৃ বু ও রোবটও পারে না। ফলে জীবন্ত স্নায়ুতন্ত্র কীভাবে সংগঠিত হয়, সেই জ্ঞান ভবিষ্যতের আরও বুদ্ধিমান কৃ বু তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

সূত্র: “Distributed control circuits across a brain-and-cord connectome” by Alexander S. Bates, Jasper S. Phelps, et.al; 8th June 2026, published in Nature. DOI: 10.1038/s41586-026-10735-w

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen + eight =