ফিবোনাচ্চির ছন্দে স্থিতিশীল কোয়ান্টাম কম্পিউটার

ফিবোনাচ্চির ছন্দে স্থিতিশীল কোয়ান্টাম কম্পিউটার

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৯ মে, ২০২৬

কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর স্থিতিশীলতার অভাব। অত্যন্ত শক্তিশালী সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, কিউবিট নামের ক্ষুদ্র কোয়ান্টাম এককগুলো খুব সহজেই বাহ্যিক পরিবেশের প্রভাবে তাদের বিশেষ অবস্থা হারিয়ে ফেলে। এবার সেই দীর্ঘ সমস্যার সমাধানের পথে বড় অগ্রগতির ইঙ্গিত দিলেন বিজ্ঞানীরা। তারা আবিষ্কার করেছেন, গণিতের বিখ্যাত ফিবোনাচ্চি সংখ্যাক্রমের ভিত্তিতে সাজানো লেজার পালস ব্যবহার করলে কিউবিট অনেক বেশি সময় ধরে স্থিতিশীল থাকতে পারে। সাধারণ কম্পিউটার তথ্য সংরক্ষণ করে বিট ব্যবহার করে, যা ০ অথবা ১ সংখ্যা দুটি ব্যবহার করে। কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটারে ব্যবহৃত হয় কিউবিট, যা একই সময়ে একাধিক অবস্থায় থাকতে পারে। এই নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের কারণে কোয়ান্টাম কম্পিউটার এমন এমন জটিল সমস্যা সমাধান করতে পারে, যা আজকের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটারের পক্ষেও প্রায় অসম্ভব। তবে বড় সমস্যা হলো, কিউবিট অত্যন্ত ভঙ্গুর। সামান্য তাপ, কম্পন বা তড়িৎ চুম্বকীয় ব্যাঘাতেই কিউবিটের কোয়ান্টাম অবস্থা নষ্ট হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা একে বলেন “ কোয়ান্টাম ডিকোহেরেন্স’’/ কোয়ান্টাম অসামঞ্জস্য।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ট্র্যাপড-আয়ন কোয়ান্টাম সিস্টেম নিয়ে কাজ করা পদার্থবিদেরা। পরীক্ষায় তারা কিউবিটের ওপর নির্দিষ্ট কাল বিরতিতে লেজার পালস পাঠান। তবে এই বিরতিগুলো ছিল না সাধারণ নিয়মিত ছন্দে। বরং সেগুলো সাজানো হয়েছিল ফিবোনাচ্চি ধারার অনুসরণে। এই ধারায় প্রতিটি সংখ্যা আগের দুটি সংখ্যার যোগফল , যেমন ১, ১, ২, ৩, ৫, ৮ ইত্যাদি।

ফল গবেষকদেরও হতবাক করেছে। সাধারণ অবস্থায় কিউবিটগুলো প্রায় ১.৫ সেকেন্ড পর্যন্ত তাদের কোয়ান্টাম অবস্থা ধরে রাখতে পারছিল। কিন্তু ফিবোনাচ্চি-ভিত্তিক পালস প্রয়োগ করার পর সেই সময় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫.৫ সেকেন্ডে। অর্থাৎ কিউবিটের স্থিতিশীলতা তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পায়।

কোয়ান্টাম কম্পিউটারে এই স্থিতিশীলতাকে বলা হয় কোহেরেন্স/সামঞ্জস্য। কিউবিট যত বেশি সময় কোহেরেন্ট থাকতে পারে, তত বেশি নির্ভুলভাবে জটিল গণনা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। কিন্তু বাস্তবে তাপ, কম্পন, বৈদ্যুতিক গোলমাল কিংবা পরিবেশগত ক্ষুদ্রতম বিঘ্নও কিউবিটকে দ্রুত ডিকোহেরেন্স/অসামঞ্জস্যর দিকে ঠেলে দেয়। ফলে তথ্য নষ্ট হয়ে যায় এবং গণনা ব্যর্থ হতে পারে।

গবেষকেরা মনে করছেন, ফিবোনাচ্চি ধারার এই অস্বাভাবিক সময়বিন্যাস কিউবিটের মধ্যে এক ধরনের টেম্পোরাল কোয়াসিক্রিস্টাল বা সময়ভিত্তিক কোয়াসিক্রিস্টালের মতো আচরণ তৈরি করেছে। কোয়াসিক্রিস্টাল এমন এক ধরনের গঠন, যেখানে শৃঙ্খলা রয়েছে, কিন্তু সেই বিন্যাস কখনও পুরোপুরি পুনরাবৃত্ত হয় না। এই অনন্য কাঠামোই সম্ভবত বাইরের গোলমাল থেকে কিউবিটকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করেছে।

গবেষণায় আরও একটি অদ্ভুত পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, সিস্টেমটি এমন আচরণ করছিল যেন সেখানে একই সঙ্গে সময়ের দুটি দিক সক্রিয় রয়েছে। তবে এর অর্থ টাইম ট্রাভেল নয়। বরং এটি কোয়ান্টাম স্তরে এমন এক জটিল গতিবিদ্যার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে ভিন্নধর্মী সময়-ছন্দ একে অপরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে কিউবিটকে আরও স্থিতিশীল রাখে।

এই আবিষ্কার ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম প্রযুক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী কিউবিট তৈরি করা এখনো কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ফিবোনাচ্চি-ভিত্তিক এই কৌশল ভবিষ্যতে আরও উন্নত হলে এমন কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি সম্ভব হবে, যা ওষুধ আবিষ্কার, জলবায়ু পূর্বাভাস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং জটিল বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিপ্লব ঘটাতে পারে।

 

সূত্র: “Dynamical topological phase realized in a trapped-ion quantum simulator,” published in Nature.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one + 11 =