ফুসফুসে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা

ফুসফুসে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২০ জুলাই, ২০২৬

আমরা প্রতিদিন অক্সিজেনের পাশাপাশি নিজেদের অজান্তেই শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করছি অসংখ্য অতি সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণা। প্লাস্টিক দূষণ যে শুধু নদী, সমুদ্র বা মাটিতেই সীমাবদ্ধ নয়, তা নতুন করে প্রমাণ করল এক গবেষণা। এর মধ্যে অনেক কণাই এত ছোট যে সেগুলো সরাসরিই ফুসফুসের গভীরে পৌঁছে যেতে পারে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে প্লস ওয়ান জার্নালে।

গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বাড়ির ঘর এবং নিজস্ব গাড়ির ভেতরের বাতাস পরীক্ষা করেন। সেখানে তারা ১ থেকে ১০ মাইক্রোমিটার আকারের বিপুল সংখ্যক মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত করেন। এই কণাগুলো এতই সূক্ষ্ম যে বাতাসে দীর্ঘ সময় ভেসে থাকতে পারে এবং মানুষের শ্বাসের সঙ্গে সহজেই শরীরে প্রবেশ করে। এগুলোর উৎস মূলত সিন্থেটিক কাপড়, প্লাস্টিকের মোড়ক, গাড়ির টায়ারের ক্ষয়, আসবাবপত্র এবং বিভিন্ন দৈনন্দিন প্লাস্টিকজাত পণ্য।

গবেষণার ফল অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন প্রায় ৩,২০০টি বড় মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা (১০–৩০০ মাইক্রোমিটার) এবং প্রায় ৬৮,০০০টি অতিক্ষুদ্র কণা (১–১০ মাইক্রোমিটার) শ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করেন। অর্থাৎ, আগে যে পরিমাণ ক্ষুদ্র মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করে বলে ধারণা করা হতো, বাস্তবে তার প্রায় ১০০ গুণ বেশি হতে পারে। গবেষকেরা বাতাসে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঘনত্ব, মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের হার এবং ঘরের ভেতরে থাকার সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই হিসাব করেছেন।

শিশুদের ক্ষেত্রেও উদ্বেগ কম নয়। তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের ধরন এবং শরীরের আকারের তুলনায় তারা আরও বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করতে পারে। ফলে বেড়ে ওঠার সময় এই ক্ষুদ্র কণার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে চিন্তিত।

যদিও মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে, তবুও বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন যে এই কণাগুলো ফুসফুসে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, কোষে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়াতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও পৌঁছে যেতে পারে। এসব সম্ভাব্য প্রভাব ভবিষ্যতে হৃদ্‌যন্ত্র, মস্তিষ্ক বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে কিনা, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

গবেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বে প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব। তাই প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহার কমানো, ঘরের বায়ু পরিশোধন ব্যবস্থা উন্নত করা এবং পরিবেশবান্ধব নতুন উপকরণ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

 

সূত্র: Yakovenko, N., et al. “Human exposure to PM10 microplastics in indoor air.” PLOS ONE.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 + 20 =