ফ্রান্সিস ক্রিক-এর মনুষ্যধর্ম

ফ্রান্সিস ক্রিক-এর মনুষ্যধর্ম

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ৭ নভেম্বর, ২০২৬

বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত মানুষের সামনে খুলে চলেছে প্রকৃতির অজস্র রহস্যের দ্বার। সেই সঙ্গে তুলছে প্রশ্ন: মানুষ কে, তার অস্তিত্বের অর্থ কী, মৃত্যুর পর জীবনের কোনও ধারাবাহিকতা আছে কি? বিখ্যাত আণবিক জীববিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ক্রিক মনে করতেন, এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে অতিপ্রাকৃত শক্তি বা ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিবর্তে মানুষের যুক্তি, বুদ্ধি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ওপর নির্ভর করা উচিত। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রে ছিল মনুষ্যধর্ম বা হিউম্যানিজম, যেখানে মানুষের সমস্যা সমাধানের প্রধান অবলম্বন মানুষ নিজেই।

ফ্রান্সিস হ্যারি কম্পটন ক্রিকের জন্ম ১৯১৬ সালের ৮ই জুন, ইংল্যান্ডে। তিনি ছিলেন আণবিক জীববিজ্ঞানী, জীবপদার্থবিদ ও স্নায়ুবিজ্ঞানী। তাঁর এবং জেমস ওয়াটসন, রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন ও মরিস উইলকিন্সের সম্মিলিত গবেষণা থেকেই প্রথম ডিএনএ অণুর দ্বিতন্ত্রী কুণ্ডলিত গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এই আবিষ্কার আধুনিক জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করে। ১৯৬২ সালে ক্রিক, ওয়াটসন ও উইলকিন্স চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।

তবে জীবনের রহস্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে ক্রিক শুধু জিন ও কোষের জগতে সীমাবদ্ধ থাকেননি। মানুষের চেতনা, মন, আত্মা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকৃতি নিয়েও তিনি গভীরভাবে চিন্তা করেছিলেন।

ক্রিক নিজেকে একজন মানবতাবাদী বা হিউম্যানিস্ট বলে পরিচয় দিতেন। তাঁর মতে, মানুষের যাবতীয় সমস্যা মানুষের নৈতিক বোধ ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্যের সাহায্যেই সমাধান করা সম্ভব। তার জন্য কোনও অতিপ্রাকৃত কর্তৃত্বের আশ্রয় নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

তিনি মনে করতেন, মানুষের বাস এই বিশাল মহাবিশ্বের একটি অতি ক্ষুদ্র অংশে। নিজের ইচ্ছায় নয়, প্রকৃতির নিয়মেই মানুষ পৃথিবীতে এসেছে। কিন্তু মানুষের অনুসন্ধিৎসু মন তাকে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করতে শেখায়। পৃথিবী কী দিয়ে তৈরি? মানুষ কী দিয়ে গঠিত? মহাবিশ্বে আমাদের অবস্থান কোথায়? অতীতে ধর্ম এই প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ক্রিকের মতে, প্রাকৃতিক জগত সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতা থেকেই ধর্মীয় ব্যাখ্যার জন্ম হয়েছে। বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যাখ্যাগুলির অনেকগুলিই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

তাঁর বক্তব্য ছিল, ধর্মীয় বিশ্বাসকে অন্ধভাবে গ্রহণ না করে প্রতিটি ধারণাকে যুক্তি ও প্রমাণের সাহায্যে যাচাই করা উচিত। তিনি মনে করতেন, বিজ্ঞান মানুষের সামনে এমন এক বিস্ময়কর জগৎ উন্মোচন করে, যা প্রতিনিয়ত নতুন প্রশ্ন ও আবিষ্কারের সুযোগ তৈরি করে দেয়। এই জগৎকে বুঝতে হলে মুক্ত চিন্তা এবং সংশয়বাদ অত্যন্ত জরুরি।

ক্রিকের চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল মানুষের আত্মা ও চেতনার প্রকৃতি। তাঁর Of Molecules and Men গ্রন্থে তিনি বিজ্ঞান ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, আত্মা যদি শরীরের বাইরে স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল হয়, তবে তার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কোথায়? মানুষের জন্মের পর ঠিক কোন মুহূর্তে আত্মার আবির্ভাব ঘটে? বিবর্তনের ইতিহাসে প্রথম জীবের মধ্যেই বা কখন আত্মার সূচনা হয়েছিল?

ক্রিকের মতে, মানুষের মন কোনও অতিপ্রাকৃত সত্তা নয়; এটি মস্তিষ্কের জৈবিক ও ভৌত ক্রিয়াকলাপের ফসল। লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষের মস্তিষ্ক গড়ে উঠেছে। স্মৃতি, অনুভূতি, চিন্তা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, চেতনা প্রভৃতি মানসিক প্রক্রিয়াগুলির পিছনেও মস্তিষ্কের ক্রিয়া রয়েছে।

তাঁর ধারণা ছিল, ভবিষ্যতে স্নায়ুবিজ্ঞান মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম কার্যপ্রণালী আরও বিশদে ব্যাখ্যা করতে পারবে। তখন মানুষের মন ও চেতনা সম্পর্কে প্রচলিত বহু ধারণাকে নতুন করে বিচার করা সম্ভব হবে। মৃত্যুর পরও শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন আত্মার অস্তিত্ব বজায় থাকে, এই বিশ্বাসের পক্ষে তিনি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দেখতে পাননি।

ক্রিক ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকাশ্য সমালোচক ছিলেন। বিশেষত খ্রিস্টধর্মের কিছু প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি তাঁর আপত্তি ছিল তীব্র। তিনি মনে করতেন, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় মতবাদ শেখানোর পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক চিন্তা, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা এবং প্রমাণভিত্তিক জ্ঞানচর্চার সুযোগ দেওয়া উচিত।

তিনি ক্রিয়েশনিজমেরও বিরোধিতা করেন। বিশেষ করে পৃথিবী অল্প কয়েক হাজার বছরের পুরোনো, এই বিশ্বাসের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অসংগতির দিকটা তিনি তুলে ধরেছিলেন। ১৯৮৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Edwards v. Aguillard মামলার সময় ক্রিক-সহ একদল নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আদালতকে জানান, ক্রিয়েশনিজম-এর কোনও স্থান সরকারি বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানশিক্ষায় থাকা উচিত নয়। তাঁদের বক্তব্য ছিল, বিজ্ঞানশিক্ষার ভিত্তি হওয়া দরকার পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ।

১৯৬০ সালে তিনি কেমব্রিজের চার্চিল কলেজে সাম্মানিক ফেলোশিপ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু পরে কলেজে একটি চ্যাপেল বা উপাসনালয় প্রতিষ্ঠার জন্য অনুদান গ্রহণের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি সেই ফেলোশিপ ত্যাগ করেন। এই ঘটনাও তাঁর ধর্ম-বিযুক্ত অবস্থানের পরিচয় বহন করে।

ধর্মের প্রতি সংশয়ী ক্রিক ধর্মীয় আচরণগুলির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খোঁজার কথাও ভেবেছিলেন। ১৯৬৯ সালে বিজ্ঞানপত্রিকা নেচার-এর শতবর্ষ উপলক্ষে প্রকাশিত একটি লেখায় তিনি বায়োকেমিক্যাল থিওলজি বা জৈবরাসায়নিক ধর্মতত্ত্বের সম্ভাবনার কথা বলেন।

তাঁর ধারণা ছিল, প্রার্থনার সময় মানুষের মস্তিষ্কে কিছু রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। নির্দিষ্ট নিউরোট্রান্সমিটার বা নিউরোহরমোনের মাত্রায় পরিবর্তন ঘটলে তা পরিমাপ করা সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ, প্রার্থনার সময় মানুষের মানসিক অবস্থার যে পরিবর্তন ঘটে, তার জৈবিক ভিত্তি অনুসন্ধান করা যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে স্নায়ুবিজ্ঞান ও ধর্মীয় অভিজ্ঞতার সম্পর্ক নিয়ে যে ‘নিউরোথিওলজি’ ক্ষেত্র গড়ে উঠেছে, তার সঙ্গে ক্রিকের এই ভাবনার কিছু মিল রয়েছে। তবে তাঁর প্রস্তাবিত ধারণাটি কোনও প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত ছিল না।

২০০৩ সালে ক্রিক ২২ জন নোবেলজয়ীর সঙ্গে ‘হিউম্যানিস্ট ম্যানিফেস্টো’-তে স্বাক্ষর করেন। তিনি ডারউইনের বিবর্তনবাদকে বিজ্ঞানশিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে তো ছিলেনই, উপরন্তু ব্রিটেনে ডারউইন দিবসকে জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব সমর্থন করেছিলেন।

২০০৪ সালের ২৮শে জুলাই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর চিন্তার মূল প্রশ্নগুলি আজও প্রাসঙ্গিক। মানুষকে বুঝতে কি অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যার আশ্রয় নিতেই হবে, নাকি প্রকৃতি ও মস্তিষ্কের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানই আমাদের নতুন পথ দেখাতে পারে?

আসলে, ক্রিকের মনুষ্যধর্ম কোনও চূড়ান্ত উত্তর দেওয়ার মতবাদ ছিল না। এটি ছিল প্রচলিত বিশ্বাসকে যাচাই করার এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য অনুসন্ধানের আহ্বান। তাঁর মতে, মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে অন্ধ আনুগত্যের ওপর নয়, বরং যুক্তিবোধ, নৈতিক দায়িত্ব ও জ্ঞানচর্চার ওপর। মহাবিশ্বে মানুষের অবস্থান বুঝতে হলে মানুষকেই নিজের অনুসন্ধানের দায়িত্ব নিতে হবে। এই ছিল ক্রিকের মানবতাবাদী দর্শনের কেন্দ্রীয় বার্তা।

 

সূত্র: http://ow.ly/WXSm30cob3q

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × 4 =