অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক ড. জোসেফ বেটম্যান ২০২৫ সালের ‘ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্স’ (আইওপি) ‘মেডিক্যাল ফিজিক্স গ্রুপ পিএইচডি’ পুরস্কার পেয়েছেন। ক্যানসার চিকিৎসার নতুন পদ্ধতি ‘ফ্ল্যাশ রেডিওথেরাপি’-র জন্য ডিটেক্টর উন্নয়ন বিষয়ে তাঁর গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবেই তাঁকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। তাঁর গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন অধ্যাপক মঞ্জিত দোসাঞ্জ। ফ্ল্যাশ রেডিওথেরাপি-কে বর্তমানে ক্যানসার চিকিৎসার এক সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রচলিত রেডিওথেরাপিতে যেখানে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ ধরে ধাপে ধাপে বিকিরণ দেওয়া হয়, সেখানে ফ্ল্যাশ পদ্ধতিতে অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার বিকিরণ এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে দেওয়া হয়। গবেষকদের ধারণা, এই পদ্ধতি টিউমার ধ্বংসে কার্যকর হতে পারে, আবার একই সঙ্গে সুস্থ কোষকলার ক্ষতিও কমাতে পারে। তবে এই প্রযুক্তি চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহারের আগে বড় একটি সমস্যা সমাধান করা জরুরি। এত দ্রুত ও এত উচ্চ মাত্রার বিকিরণ সঠিকভাবে মাপার জন্য প্রচলিত ‘ডোজিমেট্রি’ পদ্ধতি কার্যকর নয়। অর্থাৎ রোগীকে কতটা বিকিরণ দেওয়া হচ্ছে, তা নির্ভুলভাবে জানা কঠিন হয়ে পড়ে। ড. বেটম্যানের গবেষণা এই সমস্যার সমাধানেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউরোপীয় গবেষণা সংস্থা সার্নের কেন্দ্রে যৌথভাবে কাজ করেন। সেখানে তিনি খুব উচ্চ শক্তির ইলেকট্রন রশ্মিগুচ্ছ ভিত্তিক ফ্ল্যাশ প্রযুক্তির জন্য নতুন পরিমাপ পদ্ধতি তৈরি করেন। তাছাড়া সিলিকা অপটিক্যাল ফাইবারভিত্তিক একটি নতুন ডিটেক্টরও তৈরি করেন। এই ডিটেক্টর চেরেনকভ বিকিরণ ব্যবহার করে কাজ করে। এর মাধ্যমে ন্যানোসেকেন্ড সময়ে, ক্ষুদ্র ইলেকট্রন পালসের তীব্রতা ও আকার তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। এত দ্রুতগতির রশ্মিগুচ্ছ মাপার ক্ষেত্রে এটি এক বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, তিনি অতিউচ্চ ডোজ রেট পরিবেশে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে বিকিরণের মাত্রা মাপার একটি পদ্ধতিও তৈরি করেছেন, যেখানে রেডিওক্রোমিক ফিল্ম ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতি বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা দল ফ্ল্যাশ গবেষণায় ব্যবহার করেছে। ফলত খুব উচ্চ শক্তির ইলেকট্রন রশ্মিগুচ্ছ ফেলে প্রথমবার পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফ্ল্যাশ এফেক্ট’ দেখানো সম্ভব হয়েছে। পুরস্কার পাওয়ার পর ড. বেটম্যান বলেন, ফ্ল্যাশ রেডিওথেরাপি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে অ্যাক্সিলারেটর পদার্থবিদ্যা, মেডিক্যাল ফিজিক্স, রেডিওবায়োলজি এবং ক্লিনিক্যাল অঙ্কলজি একসঙ্গে কাজ করে। এই বহুমাত্রিক সংযোগই গবেষণাটিকে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় করেছে। অধ্যাপক মঞ্জিত দোসাঞ্জ অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “জোসেফের গবেষণা ফ্ল্যাশ রেডিওথেরাপিতে বাস্তব অগ্রগতি এনেছে। বিশেষ করে ডোজিমেট্রি উন্নয়ন এবং নতুন সিলিকা ফাইবার ডিটেক্টর তৈরির কাজ পূর্ণ মাত্রায় এই স্বীকৃতির যোগ্য’’। আইওপি বিচারক প্যানেল জানিয়েছে, “এ বছর জমা পড়া গবেষণাগুলোর মান ছিল অত্যন্ত উচ্চ। এর মধ্যেও ড. বেটম্যানের কাজ বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ, মৌলিকত্ব এবং বাস্তব প্রভাবের জন্য বিশেষভাবে আলাদা হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে তাঁকে মেডিক্যাল ফিজিক্স গ্রুপের এক সভায় বক্তব্য পেশ করার আমন্ত্রণও জানানো হবে’’। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের গবেষণা ভবিষ্যতে ক্যানসার চিকিৎসাকে আরও দ্রুত, নিরাপদ ও কার্যকর করতে পারে।
সূত্র: University of Oxford; Department of Physics; March, 2026
