বজ্রাঘাতে অজেয় বাইসন

বজ্রাঘাতে অজেয় বাইসন

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৫ মে, ২০২৬

উত্তর আমেরিকার বাইসনের শরীরের গঠন প্রকৃতির এক বিস্ময়। সে যেন শক্তি, সহনশীলতা আর বেঁচে থাকার জন্য বিশেষভাবে তৈরি একটি জীবন্ত যন্ত্র। একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ বাইসনের ওজন প্রায় দুই হাজার পাউন্ড, আর তার শরীরের সবচেয়ে ভারী অংশটি থাকে সামনের কাঁধের বিশাল কুঁজে। এই কুঁজটি লম্বা মেরুদণ্ডের হাড় এবং ঘন, শক্তিশালী পেশী দ্বারা গঠিত। এটাই তাকে প্রচণ্ড ধাক্কা বা আঘাত সহ্য করার অসাধারণ ক্ষমতা দেয়। তুষারঝড়, প্রেইরির আগুন, কিংবা শিকারী প্রাণীর আক্রমণ—সবকিছুর বিরুদ্ধে টিকে থাকার জন্যই তাদের এই রূপান্তর।

সাধারণত বাইসনের সহনশীলতা মাপা হয় তারা কতটা দক্ষতার সঙ্গে গ্রিজলি ভালুক বা নেকড়ের দলের আক্রমণ প্রতিহত করতে পারে তাই দিয়ে। কিন্তু ২০১৩ সালের গ্রীষ্মে, আইওয়া অঙ্গরাজ্যে ঘটে যাওয়া এক অভূতপূর্ব ঘটনা এই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিডওয়েস্ট অঞ্চলে অবস্থিত নীল স্মিথ ন্যাশনাল রিফিউজ-এ প্রবল বজ্রঝড়ের সময় এক বিশাল বজ্রপাত সরাসরি আঘাত হানে একটি একাকী, পূর্ণবয়স্ক বাইসনের ওপর।

বজ্রপাতের শক্তি অকল্পনীয়। একটি সাধারণ বজ্রপাত প্রায় ৩০ কোটি ভোল্ট বিদ্যুৎ বহন করে। এই পরিমাণ শক্তি যদি গরু বা ঘোড়ার মতো কোনো সাধারণ গৃহপালিত প্রাণীর ওপর পড়ে, তাহলে পরিণাম প্রায় নিশ্চিত মৃত্যু। হৃদযন্ত্র থেমে যায়, স্নায়ুতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যায়, এমনকি শরীরের অভ্যন্তরের তরল পর্যন্ত বেরিয়ে আসতে পারে।

কিন্তু এই বাইসনটি সেই প্রচণ্ড আঘাতের পরও বেঁচে যায়। বজ্রপাত তার পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং তার পুরু চামড়ার একটা বড় অংশ পুড়িয়ে দেয়, ফলে তার কুঁজ এবং পাঁজরের ওপর একটি গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়। কয়েকদিন পর জীববিজ্ঞানীরা তাকে প্রেইরির ঘাসের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন—দগ্ধ, ক্ষতবিক্ষত, দুর্বল। আঘাতের কারণে সে কিছুদিন খাবার সংগ্রহ করতে পারেনি, ফলে ওজনও কমে গিয়েছিল। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, সংক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ অঙ্গ বিকলের কারণে সে বাঁচবে না।

কিন্তু প্রকৃতি অন্য গল্প সাজিয়েছিল। বাইসনটি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে। তার শক্তিশালী শরীর বজ্রপাতের আঘাত হজম করে নিতে সক্ষম হয়। ক্ষত শুকিয়ে গিয়ে একটি বড় দাগে পরিণত হয়, সে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। পরে সে দলে নিজের অবস্থান পুনরুদ্ধার করে এবং সফলভাবে প্রজননও করে। আশ্রয়স্থলের কর্মীরা তাকে স্নেহভরে স্পার্কি নামে ডাকতে শুরু করেন। সে আরও পাঁচ বছর বেঁচে ছিল এবং ১৪ বছর বয়সে স্বাভাবিকভাবেই মারা যায়।

এই ঘটনাটি প্রেইরির কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরে। এখানে টিকে থাকতে হলে প্রাণীকে হতে হয় অবিশ্বাস্যভাবে শক্ত ও সহ্য ক্ষমতা র অধিকারী। উত্তর আমেরিকার বাইসন ঠিক তেমনই।প্রকৃতির কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এক জীবন্ত বর্মের মতো।

 

সূত্র: U.S Fish and wildlife service.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 + 13 =