উত্তর আমেরিকার পূর্ব প্রান্তে প্রায় ৩,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অ্যাপালাচিয়ান পর্বতমালা। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, এ যেন একটিই প্রাচীন, একটানা পর্বতশ্রেণি। কিন্তু ভূতত্ত্বের চোখে ছবিটা একেবারেই আলাদা। অ্যাপালাচিয়ান আসলে একটি মাত্র পর্বতের গল্প নয়। এর শরীরে লেখা রয়েছে বহু পর্বতগঠন পর্বের ইতিহাস। পৃথিবীর ভূত্বকের টানাপোড়েন, মহাদেশের সংঘর্ষ, সমুদ্রের জন্ম ও বিলুপ্তি এবং কোটি কোটি বছরের ক্ষয় মিলেই তৈরি করেছে আজকের এই ভূদৃশ্য।
আজকের অ্যাপালাচিয়ান তুলনামূলকভাবে নীচু। উত্তর ক্যারোলাইনার মাউন্ট মিচেল, এই পর্বতমালার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,০৩৭ মিটার উঁচু। হিমালয় বা আন্দিজের তুলনায় এই উচ্চতা খুব বেশি নয়। অথচ এই শান্ত, সবুজ পাহাড়গুলির অতীত ছিল অত্যন্ত অশান্ত। এমন এক সময়ও ছিল, যখন অ্যাপালাচিয়ান অঞ্চলে তৈরি হওয়া পর্বতগুলি আজকের হিমালয়ের সঙ্গে উচ্চতায় তুলনীয় হতে পারত বলে ভূতাত্ত্বিকরা মনে করেন।
এই গল্পের সবচেয়ে পুরনো অধ্যায় শুরু হয় প্রায় ১৩০ থেকে ১০০ কোটি বছর আগে। তখন পৃথিবীর ভূখণ্ড আজকের মতো ছিল না। মহাদেশগুলি একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেত, আবার আলাদা হয়ে যেত। ‘গ্রেনভিল অরোজেনি’ নামে পরিচিত সেই প্রাচীন পর্বতগঠন পর্বে একাধিক মহাদেশীয় ভূখণ্ডের সংঘর্ষে তৈরি হয়েছিল বিশাল পর্বতশ্রেণি। সেই সময়ের গনাইস ও গ্রানাইট আজও ব্লু রিজ ও পিডমন্ট অঞ্চলের ভূগর্ভে এবং কিছু জায়গায় ভূপৃষ্ঠে দেখা যায়। অর্থাৎ আজকের পাহাড়ের গায়ে যে পাথর রয়েছে, তার একটি অংশ আসলে এমন এক পর্বতের গভীর শিকড়, যার চূড়া বহু আগেই ক্ষয়ে মুছে গিয়েছে।
তারপর পৃথিবীর মানচিত্র আবার বদলাতে শুরু করে। প্রায় ৭৮ থেকে ৭৫ কোটি বছর আগে উত্তর আমেরিকার প্রাচীন ভূখণ্ডের প্রান্তে শুরু হয় ভূত্বকের প্রসারণ ও ফাটল তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া। অতিমহাদেশ রোডিনিয়া ভাঙতে থাকে। পরে এই বিচ্ছিন্নতার ধারাবাহিকতায় খুলে যায় প্রাচীন আইপেটাস মহাসাগর। অর্থাৎ অ্যাপালাচিয়ানের ইতিহাস শুধু পাহাড় তৈরির নয়, পাহাড় ভেঙে সমুদ্র তৈরি হওয়ার ইতিহাসও বটে। কিন্তু সেই সমুদ্রও চিরস্থায়ী হয়নি। প্রায় ৪৬ কোটি বছর আগে সমুদ্রের তলায় থাকা আগ্নেয় দ্বীপমালা ও ভূখণ্ডের অংশগুলি উত্তর আমেরিকার প্রাচীন মহাদেশীয় প্রান্ত লরেনশিয়ার দিকে এগিয়ে এসে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় ট্যাকোনিক অরোজেনি, অর্থাৎ একটি বড় পর্বতগঠনকারী ভূতাত্ত্বিক পর্ব। এই সংঘর্ষে ভূত্বকে প্রবল চাপ সৃষ্টি হয়, শিলা ভাঁজ খায় এবং নতুন পর্বত তৈরি হতে শুরু করে।
এরপরও সংঘর্ষ থামেনি। ডেভোনিয়ান যুগে শুরু হয় অ্যাকাডিয়ান অরোজেনি। উত্তর অ্যাপালাচিয়ানে এই পর্বে বিভিন্ন ভূখণ্ড ও মহাদেশীয় অংশের সংঘর্ষ ঘটে। এর ফলে তৈরি হয় বিপুল পরিমাণ পলি। তা পাহাড় থেকে ক্ষয় হয়ে নেমে আসে নদী ও স্রোতের সঙ্গে। সেই পলি জমতে থাকে অ্যাপালাচিয়ান অববাহিকায়। আজকের বহু স্তরযুক্ত বেলেপাথর, শেল ও অন্যান্য পাললিক শিলার মধ্যে তাই লুকিয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া পাহাড়গুলির স্মৃতি।
শেষ বড় পর্বতগঠনকারী ধাক্কাটি আসে কার্বনিফেরাস ও পার্মিয়ান যুগে। প্রায় ৩৩.৫ থেকে ২৬ কোটি বছর আগে লরেনশিয়া এবং পশ্চিম গন্ডোয়ানার মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। পশ্চিম গন্ডোয়ানার অন্যতম প্রধান অংশ ছিল আফ্রিকা। এই সংঘর্ষের ফলেই ঘটে অ্যালেঘেনিয়ান অরোজেনি। ভূত্বকের বিশাল অংশ একে অপরের উপর ঠেলে উঠে আসে, তৈরি হয় দীর্ঘ ভাঁজ ও থ্রাস্ট ফল্ট। এই প্রক্রিয়াই অ্যাপালাচিয়ান পর্বতমালার কেন্দ্রীয় ও দক্ষিণ অংশের বর্তমান ভূতাত্ত্বিক কাঠামো গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। একই বৃহৎ সংঘর্ষ-ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গড়ে ওঠে প্যাঞ্জিয়া।
তখন অ্যাপালাচিয়ান একা ছিল না। প্যাঞ্জিয়ার সময় উত্তর আমেরিকার এই পর্বতমালার সঙ্গে ভূতাত্ত্বিকভাবে যুক্ত ছিল আজকের ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ, স্ক্যান্ডিনেভিয়া এবং উত্তর আফ্রিকার কিছু পর্বতাঞ্চলও। পরে প্যাঞ্জিয়া ভেঙে মহাদেশগুলি আলাদা হয়ে গেলে একই প্রাচীন পর্বতবলয়ের অংশগুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে বিভিন্ন মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আজ সেই প্রাচীন সংযোগের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় অ্যাপালাচিয়ান, ইউরোপের ক্যালেডোনিয়ান পর্বত এবং উত্তর আফ্রিকার অ্যাটলাস অঞ্চলের কিছু শিলায়।
পাহাড় তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অবশ্য শুরু হয় তার ধ্বংসের প্রক্রিয়াও। বৃষ্টি, নদী, বাতাস ও মাধ্যাকর্ষণ ধীরে ধীরে পাথর সরিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। অ্যাপালাচিয়ান থেকে ক্ষয়ে যাওয়া বিপুল পরিমাণ পলি আশপাশের অববাহিকা এবং পরে সমুদ্রের দিকে সরে যায়। কোটি কোটি বছর ধরে চলা এই ক্ষয়ই একসময়ের বিশাল পর্বতকে আজকের অপেক্ষাকৃত নীচু, গোলাকার ও সবুজ পাহাড়ে পরিণত করে। কার্বনিফেরাস যুগে এই পর্বতগুলির আশপাশে ছিল উষ্ণ ও আর্দ্র জলাভূমি। সেখানে বেড়ে উঠত বিশাল বন। উদ্ভিদের সেই জৈব অবশেষ পরবর্তী সময়ে মাটির নীচে চাপা পড়ে কয়লার স্তর তৈরি করে। পরে অ্যাপালাচিয়ান অঞ্চলের কয়লা শুধু শিল্পের জ্বালানি হয়নি, বদলে দিয়েছে গোটা অঞ্চলের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রাও। প্রায় ২০ কোটি বছর আগে প্যাঞ্জিয়া ভাঙতে শুরু করলে উত্তর আমেরিকা ও অন্যান্য মহাদেশের মধ্যে নতুন সমুদ্রপথ তৈরি হয়। আটলান্টিক মহাসাগর ধীরে ধীরে প্রসারিত হতে থাকে। অ্যাপালাচিয়ান অঞ্চল আর সক্রিয় মহাদেশীয় সংঘর্ষের কেন্দ্রে রইল না। পর্বত তৈরির বদলে শুরু হল দীর্ঘ ক্ষয়ের যুগ। ভূতাত্ত্বিক অর্থে, পর্বতমালাটি যেন তার সবচেয়ে দীর্ঘ ‘বিশ্রাম’-পর্বে প্রবেশ করে।
কিন্তু এখানেই আসে রহস্য। এত পুরনো একটি পর্বতশ্রেণি, যার উপর কোটি কোটি বছর ধরে ক্ষয় চলছে, সেটি আজও কেন পুরোপুরি সমতল হয়ে যায়নি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীদের নজর এখন পাহাড়ের উপর থেকে সরে গেছে পৃথিবীর গভীরে। ২০২৫ সালে ইউনিভার্সিটি অব সাদাম্পটনের পরিচালনায় এক গবেষণায় নিউ ইংল্যান্ডের নীচে প্রায় ২০০ কিলোমিটার গভীরে একটি অস্বাভাবিক উষ্ণ অঞ্চল নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা সামনে আসে। ‘নর্দার্ন অ্যাপালাচিয়ান অ্যানোমালি’ নামে পরিচিত এই অঞ্চলটি প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার চওড়া। গবেষকদের মতে, এর উৎপত্তি বর্তমান অবস্থান থেকে প্রায় ১,৮০০ কিলোমিটার দূরে, ল্যাব্রাডর সাগর অঞ্চলে উত্তর আমেরিকা ও গ্রিনল্যান্ডের বিচ্ছিন্নতার সময়- প্রায় ৯ থেকে ৮ কোটি বছর আগে। গবেষণাটির গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হল, এই উষ্ণ অঞ্চল স্থির নয়। ম্যান্টলের গভীরে উত্তপ্ত ও ঘন পদার্থের ধীর তরঙ্গগতির সঞ্চালন বা ‘ম্যান্টল ওয়েভ’-এর মতো একটি প্রক্রিয়ায় তা মহাদেশের নীচ দিয়ে সরে আসতে পারে। কম্পিউটার মডেল, ভূকম্পন-তথ্য এবং টেকটোনিক প্লেটের প্রাচীন গতিপথ মিলিয়ে গবেষকরা মনে করছেন, এই গভীর তাপ অ্যাপালাচিয়ানের নীচের ঘন শিকড়কে দুর্বল বা পাতলা করতে পারে। ফলে উপরের ভূত্বক তুলনামূলকভাবে বেশি ভাসমান হয়ে ওঠে এবং কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে স্থানীয় উচ্চতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা পালন করতে পারে। অর্থাৎ অ্যাপালাচিয়ানের বর্তমান উচ্চতা হয়তো শুধুই অতীতের পাহাড়ের অবশেষ নয়। তার নীচে এখনও পৃথিবীর গভীর অভ্যন্তরে চলছে ধীর, অদৃশ্য এক ভূতাত্ত্বিক খেলা।
অবশ্য এই ব্যাখ্যাই শেষ কথা নয়। অ্যাপালাচিয়ানের নীচের ম্যান্টল সম্পর্কে এখনও বহু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। ভূকম্পন-তথ্য যত বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে একটি প্রাচীন পর্বতমালার বর্তমান চেহারা তৈরি হতে পারে একাধিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার সম্মিলিত প্রভাবে। তাই ব্লু রিজ পার্কওয়ে থেকে দেখা শান্ত, কুয়াশামোড়া পাহাড়টিকে শুধু ‘পুরনো পর্বত’ বললে তার গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তার শিলায় লেখা আছে এক বিলিয়ন বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাস। কোনো অংশ মহাদেশের সংঘর্ষের স্মৃতি, কোনো অংশ প্রাচীন সমুদ্রের, কোনো অংশ হারিয়ে যাওয়া পর্বতের। আর তারও গভীরে, পৃথিবীর ম্যান্টলে, হয়তো এখনও চলছে সেই শক্তির ধীর সঞ্চালন- যা কোটি কোটি বছর আগে পাহাড় তৈরি করেছে এবং আজও তাদের পুরোপুরি মুছে যেতে দেয়নি।
সূত্র: Earth . com; Aug; 2026
