বার্ধক্যজনিত রোগে যকৃত কোষের ভূমিকা 

বার্ধক্যজনিত রোগে যকৃত কোষের ভূমিকা 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৬ নভেম্বর, ২০২৬

অ্যালঝাইমার্স ও হৃদ্‌রোগের মতো বার্ধক্যজনিত অসুখের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শুধু মস্তিষ্ক বা হৃদ্‌যন্ত্র নয়, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যকৃতও। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এমন একটি পরীক্ষামূলক ওষুধের সন্ধান পেয়েছেন, যা বয়স্ক ইঁদুরের যকৃতের বিশেষ কোষগুলিকে অনেকটা তরুণ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। মাত্র দুই সপ্তাহের চিকিৎসায় তাদের রক্তে অ্যালঝাইমার্স রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত অ্যামাইলয়েড-বিটা প্রোটিনের মাত্রা প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলও নেমে এসেছে তরুণ ইঁদুরের স্বাভাবিক মাত্রায়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার কেক স্কুল অব মেডিসিনের গবেষকেরা এই আবিষ্কার করেছেন।

যকৃত শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিশোধক অঙ্গ। রক্ত থেকে বিভিন্ন ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় পদার্থ সরিয়ে ফেলাই এর প্রধান কাজ। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যকৃতের কিছু বিশেষ কোষের কার্যক্ষমতা কমে যায়। গবেষকেরা মূলত লিভার সাইনুসয়ডাল এন্ডোথেলিয়াল সেল (LSEC) নামক কোষগুলির উপর নজর দেন। এগুলি যকৃতের ক্ষুদ্র রক্তনালির গাত্র তৈরি করে। কোষগুলির গায়ে অসংখ্য অতি সূক্ষ্ম ছিদ্র থাকে, যা অনেকটা চালুনির মতো কাজ করে। এই ছিদ্র দিয়ে রক্তের বিভিন্ন উপাদান পাশের হেপাটোসাইট কোষে পৌঁছতে পারে। হেপাটোসাইটই যকৃতের অধিকাংশ পরিশোধন ও বিপাকীয় কাজ সম্পন্ন করে।

বয়স বাড়লে LSEC-এর এই সূক্ষ্ম ছিদ্রগুলি ক্রমশ বুজে আসে বা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে রক্তের কিছু ক্ষতিকর পদার্থ যকৃতের পরিশোধন প্রক্রিয়ার আওতায় আসতে পারে না। এর মধ্যে রয়েছে অ্যামাইলয়েড-বিটা, যা মস্তিষ্কে জমে অ্যালঝাইমার্স রোগের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ প্রোটিন-স্তর বা প্লাক তৈরি করতে পারে।

এই সমস্যা কাটাতে গবেষকেরা বয়স্ক ইঁদুরকে দুই সপ্তাহ ধরে সিনাকিগুয়াট নামক পরীক্ষামূলক ওষুধ দেন। দেখা যায়, ওষুধটি LSEC কোষগুলির গঠন ও কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া সূক্ষ্ম ছিদ্রগুলি আবার খুলে গিয়েছে। ফলে রক্ত থেকে অ্যামাইলয়েড-বিটা অপসারণের ক্ষমতা বেড়েছে এবং তার মাত্রা প্রায় অর্ধেক কমে তরুণ ইঁদুরের সমান হয়েছে।

গবেষণায় আরও একটি অপ্রত্যাশিত বিষয় সামনে আসে। ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বা এলডিএলের মাত্রাও তরুণ ইঁদুরের পর্যায়ে নেমে আসে। অথচ গবেষকেরা প্রথমে আশা করেননি যে ওষুধটি কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে কোনও প্রভাব ফেলবে বলে ।

এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা যকৃতের দুই ধরনের কোষের মধ্যে আগে অজানা একটি রাসায়নিক যোগাযোগব্যবস্থার সন্ধান পান। ওষুধটি LSEC কোষে সলিউবল গুয়ানাইলেট সাইক্লেজ নামের একটি উৎসেচক সক্রিয় করে। এর ফলে কোষগুলি HB-EGF নামের একটি বৃদ্ধিসহায়ক প্রোটিন নিঃসরণ করে। এই সংকেত পাশের হেপাটোসাইট কোষে পৌঁছে তাদের রক্ত থেকে অ্যামাইলয়েড-বিটা ও এলডিএল সংগ্রহের ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। এ

গবেষণার বিবরণটি জার্নাল অফ বায়োলজিক্যাল কেমেস্ট্রি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটি সত্যিই অ্যালঝাইমার্স ও হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিতবাহী। তবে এখনও পর্যন্ত পরীক্ষাটি কেবল ইঁদুরের উপরই চালানো হয়েছে। রক্তে অ্যামাইলয়েড-বিটার মাত্রা কমলেই যে মস্তিষ্কের প্লাক কমবে বা অ্যালঝাইমার প্রতিরোধ করা যাবে, তা এখনও প্রমাণিত নয়। মানুষের ক্ষেত্রে এই চিকিৎসা কতটা কার্যকর, সেটা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

এক কথায় বলতে গেলে বার্ধক্যজনিত রোগের চিকিৎসায় শুধু আক্রান্ত অঙ্গকে লক্ষ্য না করে যকৃতের মতো প্রতিবেশী অঙ্গের কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেও নতুন পথ খোঁজা সম্ভব হতে পারে।

 

সূত্র: Sam J. de Leve, Xiangdong Wang, Helia Alavifard, Lily Dara, Laurie D. DeLeve. Reversing liver sinusoidal endothelial aging restores clearance of amyloid-beta and LDL. Journal of Biological Chemistry, 2026; 302 (11): 113608 DOI: 10.1016/j.jbc.2026.113608.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

sixteen + 8 =