বালুকণার বিদ্যুৎ রহস্য

বালুকণার বিদ্যুৎ রহস্য

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৬ মে, ২০২৬

৭৯ খ্রিস্টাব্দে মাউন্ট ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে আকাশ ঢেকে গিয়েছিল ছাই, ধোঁয়া ও মৃত্যুভয়ে। সেই বিপর্যয়ের প্রত্যক্ষদর্শী রোমান লেখক প্লিনি (ছোটো) লিখেছিলেন, চারদিকে এমন ঘন অন্ধকার নেমে এসেছিল, যা মাঝেমধ্যে মশালের আলো আর বজ্রবিদ্যুতের ঝলকে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছিল। দুই হাজার বছর পর আধুনিক বিজ্ঞান জানাচ্ছে, প্লিনির দেখা সেই বজ্রপাত কোনো কল্পনা বা মনের ভুল ছিল না। বরং আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় বিদ্যুৎ চমকানো একটি বাস্তব ও পরিচিত প্রাকৃতিক ঘটনা। শুধু তাই নয়, মরুভূমির বালুঝড় কিংবা ধুলিঝড়েও একই ধরনের বৈদ্যুতিক ঝলক দেখা যায়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে কেন এই ঘটনাটা ঘটছে?

সম্প্রতি নেচার জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা এই দীর্ঘকালের রহস্যের ওপর আলোকপাত করেছে। অস্ট্রিয়ার ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির বিজ্ঞানী স্কট ওয়েইটুকাইটিস ও তাঁর সহকর্মীরা পরীক্ষা চালান সিলিকন ডাই-অক্সাইড বা কোয়ার্টজের ওপর। কোয়ার্টজ হলো বালি ও আগ্নেয় ছাইয়ের অন্যতম প্রধান উপাদান। সাধারণভাবে এটি একটি বিদ্যুৎ নিরোধী পদার্থ, অর্থাৎ সহজে বিদ্যুৎ পরিবহন করে না। তাই দুটি কোয়ার্টজ কণা একে অপরের সংস্পর্শে এলে তাদের মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জ বিনিময় হওয়ার কথা নয়। অথচ বাস্তবে ঠিক সেটাই ঘটছে।

এই ভিন্নধর্মী আচরণের কারণ খুঁজতে গবেষকেরা অত্যন্ত সূক্ষ্ম প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। ক্ষুদ্র কোয়ার্টজ কণাগুলোকে শব্দতরঙ্গের সাহায্যে বাতাসে ভাসিয়ে রাখা হয়, যাতে তারা অন্য কিছুর সংস্পর্শে এসে আহিত না হয়। এরপর একের পর এক পরীক্ষা চালানো হয়। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, জলীয় অণু হয়তো এর জন্য দায়ী। কারণ সাধারণ বজ্রঝড়ে জলের কণাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু পরীক্ষায় সেই ধারণা টেকেনি। পরে দেখা যায়, কোয়ার্টজ কণাকে উত্তপ্ত করলে সেটি ঋণাত্মক আধানগ্রস্ত হতে শুরু করে।

এরপরই সামনে আসে আসল রহস্য। বিজ্ঞানীরা জানান, আধান তৈরির মূল কারণ কোয়ার্টজ নয়, বরং তার গায়ে জমে থাকা বায়ুমণ্ডলীয় কার্বনের সূক্ষ্ম স্তর। তাপীয় প্রভাবে এই স্তরটি সরে গেলে কণাগুলো বৈদ্যুতিকভাবে আহিত হয়ে ওঠে। একই ফল পাওয়া গেছে অন্য প্রাকৃতিক ডাই-অক্সাইড নিরোধক পদার্থেও।

অর্থাৎ, মরুভূমির বালুকণা, আগ্নেয় ছাই বা ধুলোর মেঘ যখন একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায়, ঘষা লাগে বা গড়াতে থাকে, তখন তারা আধান/ চার্জ সংগ্রহ করে। সেই আধান জমে গেলে হঠাৎ স্ফুলিঙ্গ বা বজ্রপাতের মতো ঘটনা ঘটে।

এই আবিষ্কারের গুরুত্বকে শুধু আগ্নেয় বজ্রপাতের ব্যাখ্যাতেই সীমাবদ্ধ করে রাখলে চলবে না। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, মহাকাশে ধুলিকণার পারস্পরিক আধান আকর্ষণ থেকেই গ্রহ গঠনের প্রাথমিক ধাপ হয়তো শুরু হয়ে থাকতে পারে। এমনকি পৃথিবীর আদিম যুগে সরল অ্যামিনো অ্যাসিড থেকে জটিল প্রোটিন তৈরির পথেও হয়তো ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গেরই ভূমিকা থাকতে পারে। এভাবেই, বালুকণার আচরণ বুঝতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা কি আবিষ্কার করে ফেললেন গোটা সৃষ্টির রহস্য?

 

সূত্র: nature.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × four =