বিজ্ঞানে ব্যর্থতাও শিক্ষাপ্রদ

বিজ্ঞানে ব্যর্থতাও শিক্ষাপ্রদ

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ৩ অক্টোবর, ২০২৬

বিজ্ঞানের ইতিহাস মানেই আবিষ্কার ও সাফল্যের ধারাবাহিকতা নয়। বাস্তবে একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পেছনে থাকে দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ভুল সিদ্ধান্ত, ব্যর্থ অনুসন্ধান, পরিত্যক্ত প্রকল্প, অর্থসংকট এবং কখনও কখনও রাজনৈতিক বাধাও। কণা পদার্থবিদ্যার ইতিহাসও এর ব্যতিক্রম নয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে সার্ন-এ অনুষ্ঠিত ৪র্থ ইন্টারন্যাশনাল সিম্পোজিয়াম অন দ্য হিস্ট্রি অফ পার্টিকল ফিজিক্স -এ তাই আলোচনার বিষয় ছিল শুধু কী আবিষ্কৃত হয়েছে তা নয়, বরং বিজ্ঞানীরা কোন পথে এগিয়েছিলেন, কোথায় ব্যর্থ হয়েছিলেন এবং সেই ব্যর্থতা থেকে কীভাবে নতুন জ্ঞান তৈরি হয়েছে।

এই সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে সার্ন -এর প্রাক্তন মহাপরিচালক ক্রিশ লিউইলিন স্মিথ একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন। তাঁর মতে, বিজ্ঞানীদের এমন বিষয় নিয়েও কথা বলা উচিত যা সাধারণত গবেষণাপত্রে লেখা থাকে না। যেমন ভুল, গবেষণার বন্ধ পথ, প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া এবং গবেষণার জন্য অর্থ জোগাড়ের সমস্যা ইত্যাদি। কারণ শুধু সফল পরীক্ষার ইতিহাস দেখলে বিজ্ঞানের প্রকৃত অগ্রগতির পথ বোঝা যায় না। একটি আবিষ্কারের পেছনে যে বহু ব্যর্থ প্রচেষ্টা থাকে, সেগুলিও বিজ্ঞানের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয় সার্ন -এর ৪০০ আসনের প্রধান অডিটোরিয়ামে। এই স্থানটিরও বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। সেখানে অতীতে বহু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ঘোষণা হয়েছে, যার মধ্যে হিগস বোসন আবিষ্কারের ঘোষণাও রয়েছে। অডিটোরিয়ামের বাদামি ও হালকা বেইজ রঙের দেওয়ালে ফিনল্যান্ডের শিল্পী ইলোনা রিস্তার তৈরি প্রাণবন্ত নকশা রয়েছে। লেখকের চোখে সেগুলি উচ্চ-শক্তির কণার সংঘর্ষের পর ছড়িয়ে থাকা বারকোডের মতো।

এই সম্মেলনটির প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে কণা পদার্থবিদ্যার বিকাশ। এই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক শক্তিশালী কণা-ত্বরক এবং শনাক্তকারী যন্ত্র নির্মিত ও পরিচালিত হয়। সার্ন-এ সুপার প্রোটন সিঙ্কোট্রন (SPS)-এর সঙ্গে যুক্ত UA1 ও UA2 পরীক্ষার মাধ্যমে ১৯৮৩ সালে W ও Z বোসন আবিষ্কৃত হয়। এই কণাগুলি দুর্বল নিউক্লীয় বলের প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীতে সার্ন -এ লার্জ ইলেক্ট্রন পজিট্রন প্রকল্প (LEP) ১৯৮৯ সালে চালু হয়। এর কয়েক বছর পর, ১৯৯৪ সালে, বর্তমানের বৃহৎ লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার (LHC) প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়।

এই সময়ে শুধু ইউরোপেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রেও কণা পদার্থবিদ্যার পরিকাঠামো দ্রুত বাড়ছিল। সট্যানফোর্ড লিনিয়ার আক্সেলারেটর সেন্টারে ১৯৮০ সালে পজিট্রন-ইলেক্ট্রন প্রকল্প এবং ১৯৮৯ সালে স্ট্যানফোর্ড লিনিয়ার প্রকল্প চালু হয়। তবে সবচেয়ে পরিচিত প্রকল্পগুলির একটি ছিল ফার্মিল্যাবের টিভেট্রন, যা ১৯৮৩ সালে চালু হয়। পরে এই ত্বরকেই ১৯৯৫ সালে টপ কোয়ার্ক আবিষ্কার করা হয়। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ডুবনাতেও বিজ্ঞানীরা নিউক্লোট্রন নামে একটি উচ্চ পরিবাহী সিঙ্ক্রোট্রোন তৈরি করেন, যা ১৯৯২ সালে চালু হয়।

কিন্তু এই সময়ের ইতিহাস শুধুই নতুন ত্বরক নির্মাণের ইতিহাস নয়। বহু উচ্চাভিলাষী প্রকল্প শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রে proton–proton collider ISABELLE ১৯৮৩ সালে বাতিল করা হয়। এক দশক পরে বন্ধ হয়ে যায় আরও বড় Superconducting Super Collider (SSC) প্রকল্প। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নও বহু-TeV শক্তির proton–proton collider UNK প্রকল্প পরিত্যাগ করে। এই ঘটনাগুলি থেকেই প্রমাণ পাওয়া যায়, বৈজ্ঞানিক স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য শুধু নতুন প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক দক্ষতাই যথেষ্ট নয়। বিপুল অর্থ, রাজনৈতিক সমর্থন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন। আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সম্প্রতি রাশিয়া হয়তো UNK প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করার কথা ভাবছে, যদিও সেটি একটি ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা হিসেবেই উপস্থাপিত হয়েছে।

সম্মেলনে ১৯৮৩ সালের W ও Z বোসন আবিষ্কার এবং ১৯৯৫ সালের টপ কোয়ার্ক আবিষ্কারের মতো বড় সাফল্যের পাশাপাশি আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার কথাও উঠে আসে—সোলার নিউট্রিনো সমস্যার কথা। তাত্ত্বিক হিসাব অনুযায়ী সূর্য থেকে যত নিউট্রিনো পৃথিবীতে পৌঁছানোর কথা, পরীক্ষায় তার তুলনায় অনেক কম নিউট্রিনো শনাক্ত হচ্ছিল। প্রথমে এটি বিজ্ঞানীদের কাছে একটি বড় অসামঞ্জস্য বলে মনে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৮ সালে জাপানি পদার্থবিদ তাকাকি কাজিতা নিউট্রিনোর দোলন বা এক ধরনের রূপান্তরের প্রমাণ আবিষ্কার করেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, নিউট্রিনো এক ধরনের অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তিত হতে পারে এবং সেই কারণেই পৃথিবীতে পৌঁছানোর সময় প্রত্যাশিত সংখ্যার তুলনায় কম নিউট্রিনো শনাক্ত হতে পারে। এই কাজের জন্য কাজিতা এবং কানাডীয় পদার্থবিদ আর্ট ম্যাকডোনাল্ড ২০১৫ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার ভাগ করে নেন।

তবে কণা পদার্থবিদ্যার সব অনুসন্ধানের পরিণতি এমন সফল হয়নি । বিজ্ঞানীরা প্রোটনের ক্ষয়, অ্যাক্সিয়ন, ম্যাগনেটিক মোনোপোল, হিগস- বোসন সুপারসিমেট্রির কণা এবং আরও নানা অজানা কণার সন্ধান চালিয়েছেন। এসব অনুসন্ধানের অনেকগুলিই প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। প্রশ্নোত্তর পর্বে গ্রিক পদার্থবিদ কোস্টাস গ্যাভ্রোগ্লু এই ধরনের বহু অনুসন্ধানকে ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন। কিন্তু মূল বক্তব্য হল, বিজ্ঞানী মহলে ব্যর্থতা শব্দটির অর্থ একটু ভিন্নভাবে দেখা দরকার। কোনও পরীক্ষা কাঙ্ক্ষিত কণা খুঁজে না পেলেও সেটি প্রকৃতপক্ষে মূল্যহীন হয়ে যায় না। কারণ একটি কণার অস্তিত্বের প্রমাণ না পাওয়াটাও নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক ধারণার সীমা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে এবং ভবিষ্যতের গবেষণার পথ পরিবর্তন করতে পারে।

এই সময়ে কণা পদার্থবিদ্যার সঙ্গে মহাবিশ্ববিদ্যার সম্পর্কও আরও গভীর হয়। কণাতাত্ত্বিক মহাকাশতত্ত্ব, অর্থাৎ মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে মৌলিক কণা এবং তাদের পারস্পরিক ক্রিয়ার ব্যবহার, একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্র হয়ে ওঠে। কেউ কেউ রসিকতা করে মহাবিশ্বকেই স্বর্গীয় গবেষণাগার হিসেবে অভিহিত করেছেন। পৃথিবীর পরীক্ষাগারে যে বিপুল শক্তি তৈরি করা কঠিন, মহাবিশ্বের প্রাথমিক পর্যায় বা মহাজাগতিক ঘটনায় তার স্বাভাবিক পরিবেশ পাওয়া যায়। ফলে কণা পদার্থবিদ্যা ও মহাবিশ্ব তত্ত্বের মধ্যে সহযোগিতা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

একই সময়ে স্ট্রিং থিওরি, গ্রান্ড ইউনিফাইড থিওরি এবং পার্টারবেটিভ কোয়ান্টাম ক্রোমোডাইনামিক্স (QCD)-এর মতো তাত্ত্বিক ক্ষেত্রও বিকশিত হয়। এগুলির লক্ষ্য ছিল প্রকৃতির মৌলিক শক্তি ও কণাগুলিকে আরও গভীর ও একীভূত কাঠামোর মধ্যে বোঝা। সব তত্ত্বের পরীক্ষামূলক প্রমাণ এখনও সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়, কিন্তু এগুলি কণা পদার্থবিদ্যার প্রশ্নকে আরও বিস্তৃত করেছে।

লেখক রবার্ট পি. ক্রিসের মতে, আধুনিক কণা পদার্থবিদ্যা এখন ক্রমশ আরও আন্তঃবিষয়ক পদ্ধতি ব্যবহার করে আরও অদ্ভুত ও অজানা প্রাকৃতিক ঘটনাকে অনুসন্ধান করছে। কণা পদার্থবিদ্যা, মহাবিশ্ববিদ্যা, গণিত, কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং অন্যান্য ক্ষেত্রের মধ্যে সহযোগিতা এই গবেষণাকে নতুন সম্ভাবনা দিচ্ছে। কিন্তু এর পাশাপাশি আধুনিক বিশ্বের একটি বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে। মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে বিচ্ছিন্নতা, খণ্ডীকরণ এবং মেরুকরণ বাড়ছে। গবেষণার ক্ষেত্র যখন আরও আন্তঃবিষয়ক সহযোগিতা দাবি করছে, তখন সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতার পরিবর্তে বিভাজন বাড়লে সেই উচ্চাভিলাষী বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

এই সম্মেলন থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষা কেবল কণা পদার্থবিদ্যার অতীতকে স্মরণ করা নয়। বরং ভবিষ্যতে বিজ্ঞান কীভাবে এগোবে, তারও একটি ইঙ্গিত দেওয়া। বিজ্ঞান কখনও সোজা পথে এগোয় না। একটি সফল আবিষ্কারের আগে বহু ভুল ধারণা, ব্যর্থ পরীক্ষা এবং অসম্পূর্ণ প্রকল্প থাকতে পারে। কখনও একটি বাতিল প্রকল্পের প্রযুক্তি বা অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের গবেষণায় কাজে লাগে; কখনও কোনও ব্যর্থ অনুসন্ধান বিজ্ঞানীদের কাছে নতুন প্রশ্ন তোলে। আবার কখনও দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা শেষ পর্যন্ত নতুন মৌলিক পদার্থবিদ্যার দরজা খুলে দেয়।

ব্যর্থতা বিজ্ঞানের বিপ্রতীপ নয়, বরং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিরই একটি অংশ। অতীতের সাফল্য যেমন ভবিষ্যৎ গবেষণাকে অনুপ্রাণিত করে, তেমনি ভুল ও ব্যর্থতার ইতিহাসও বিজ্ঞানীদের জানায় কোন পথ থেকে ফিরে এসে নতুন পথে এগোতে হবে। আর সেই অগ্রগতির জন্য দরকার মুক্ত চিন্তন, আন্তঃবিষয়ক সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ। এই মূল্যবোধগুলিই আধুনিক বিশ্বের বিভাজন ও বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

 

সূত্র: physicsworld.com/particle-nuclear, Physics World | Particle & Nuclear Briefing Opinion.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 + 2 =