বিশৃঙ্খল কণিকা জগতে শৃঙ্খলা আনেন মারে গেল-মান  

বিশৃঙ্খল কণিকা জগতে শৃঙ্খলা আনেন মারে গেল-মান  

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

১৯২৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বিংশ শতাব্দীর প্রবাদপ্রতিম মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ মারে গেল-মান নিউইয়র্ক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পদার্থবিদ্যায় তাঁর অন্যতম অবদান হল- উপপরমাণু কণার জটিল ও বিভ্রান্তিকর জগতকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে আনা। ২০১৯ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের মূল লক্ষ্য ছিল—প্রকৃতির আপাত বিশৃঙ্খলার মধ্যে লুকিয়ে থাকা নিয়ম ও বিন্যাস খুঁজে বের করা।

ছোটবেলা থেকেই গেল-মান ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এরপর ২১ বছর বয়সে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে পদার্থবিদ্যায় পিএইচ ডি করেন। পরবর্তীকালে তাঁর গবেষণা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কণা-পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে।

১৯৫০-এর দশকে বিজ্ঞানীরা একের পর এক নতুন অবপরমাণু কণা আবিষ্কার করছিলেন। এই নতুন কণাগুলোর বৈশিষ্ট্য বোঝা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিল। এর মধ্যে কিছু কণাকে বলা হতো স্ট্রেঞ্জ কণা। কারণ, এদের আচরণ বেশ রহস্যজনক। শক্তিশালী নিউক্লীয় বলের মাধ্যমে এগুলো সহজেই তৈরি হতে পারত, কিন্তু দুর্বল নিউক্লীয় বলের মাধ্যমে তাদের ক্ষয় হতো তুলনামূলকভাবে অনেক ধীরে। এই আপাত-বিরোধী আচরণ ব্যাখ্যা করতে ১৯৫৩ সালে গেল-মান স্ট্রেঞ্জনেস নামে একটি নতুন কোয়ান্টাম সংখ্যা প্রস্তাব করেন। এই একই ধারণা প্রায় একই সময়ে জাপানি পদার্থবিদ কাজুহিকো নিশিজিমাও আলাদা করে প্রস্তাব করেছিলেন।

তবে গেল-মান সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজটি করেন ১৯৬১ সালে। তখন আবিষ্কৃত কণার সংখ্যা এত বেড়ে গিয়েছিল যে পরিস্থিতিকে অনেক সময় কণা চিড়িয়াখানা বলা হতো। গেল-মান এই বিপুল সংখ্যক কণাকে তাদের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কয়েকটি সুন্দর ও নিয়মিত পরিবারে সাজানোর একটি পদ্ধতি তৈরি করেন। এর ভিত্তি ছিল আনুমানিক SU(3) ফ্লেভার প্রতিসাম্য (কণা পদার্থবিজ্ঞানে কোয়ার্কের প্রকার বা ধরনকে বলা হয় ফ্লেভার)। খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে কোনো গাণিতিক গ্রুপ/নিয়ম অনুযায়ী তিন ধরনের কোয়ার্ককে একে অপরের দ্বারা প্রতিস্থাপিত/ পরিবর্তিত করে কণাগুলোর অভ্যন্তরীণ শক্তিশালী বল/ মিথস্ক্রিয়া অপরিবর্তিত থাকে। তিনি এই শ্রেণিবিন্যাসের নাম দেন Eightfold Way বা অষ্টাঙ্গ পথ।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ধারণাটি কেবল গেল-মানের একার ছিল না। ইজরায়েলি পদার্থবিদ ইউভাল নে’মান প্রায় একই সময়ে আলাদা ভাবে একই ধরনের শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করেছিলেন। কণাগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকা নিয়ম খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে দুই বিজ্ঞানীর গবেষণা স্বাধীনভাবে একই দিকে এগিয়েছিল। অষ্টমুখী পথের সবচেয়ে বড় সাফল্য হল, এটি শুধু পরিচিত কণাগুলোকে সাজায়নি, উপরন্তু নতুন কণার অস্তিত্বের পূর্বাভাসও দিয়েছিল। একটি দশ-সদস্যের ব্যারিয়ন পরিবারের একটি কণা তখনও আবিষ্কৃত হয়নি। তত্ত্ব অনুযায়ী সেই অনুপস্থিত কণাটির বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট হওয়ার কথা ছিল। ১৯৬৪ সালে ব্রুকহেভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে সেই কণাই আবিষ্কৃত হয়, যার নাম ওমেগা-মাইনাস (Ω⁻)। পরীক্ষায় এর বৈশিষ্ট্য তাত্ত্বিক পূর্বাভাসের সঙ্গে অত্যন্ত ভালোভাবে মিলে যায়। ফলে অষ্টমুখী পথ যে কণাজগতের অন্তর্নিহিত কাঠামো সম্পর্কে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে, তার শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যায়।

ওই ১৯৬৪ সালেই গেল-মান আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা সামনে আনেন। তিনি প্রস্তাব করেন, প্রোটন ও নিউট্রন প্রভৃতি হ্যাড্রন কণাগুলো মৌলিক নয়; তারা ক্ষুদ্রতর কিছু উপাদান দিয়ে তৈরি। তিনি এই কাল্পনিক ক্ষুদ্র কণাগুলোর নাম দেন বা কোয়ার্ক। নামটি তিনি নিয়েছিলেন জেমস জয়েসের উপন্যাস ফিনেগানস ওয়েক-এর একটি কাল্পনিক বাক্য “Three quarks for Muster Mark!’’ থেকে।

এ ক্ষেত্রেও তিনি একা ছিলেন না। সার্ন-এর বিজ্ঞানী জর্জ জ্‌ভাইগ নিজের মতো করে প্রায় একই ধরনের ধারণায় উপনীত হয়েছিলেন। তবে তিনি এই কণাগুলোর নাম দিয়েছিলেন ‘aces’ (টেক্কা) । অর্থাৎ, কোয়ার্ক ধারণাটিরও দুটি স্বাধীন উৎস ছিল।

১৯৬৯ সালে গেল-মান পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান। পুরস্কারটি দেওয়া হয়েছিল মৌলিক কণার শ্রেণিবিন্যাস এবং তাদের পারস্পরিক ক্রিয়া সম্পর্কে তাঁর অবদানের জন্য। মজার বিষয়, নোবেলের সরকারি উদ্ধৃতিতে কোয়ার্ক শব্দটি উল্লেখ করা হয়নি। কারণ তখনো কোয়ার্ক মডেল পরীক্ষামূলকভাবে সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি।

তবে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছিল। ১৯৬৮ সালে SLAC-এর পরীক্ষায় প্রোটনের ভেতরে বিন্দুর মতো ক্ষুদ্র উপাদানের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রথমদিকে এগুলোকে পার্টন বলা হয়েছিল। পরে শক্তিশালী নিউক্লীয় বলের আধুনিক তত্ত্ব বা কোয়ান্টাম ক্রোমোডায়নামিক্স (QCD) বিকশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই পার্টনগুলোর সঙ্গে কোয়ার্কের সম্পর্ক ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৭৭ সালে গেল-মান এবং জর্জ জ্‌ভাইগ—দুজনেরই নাম কোয়ার্ক তত্ত্বে অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কারের জন্য প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই কাজের জন্য তাঁদের কেউ নোবেল পাননি। গেল-মানের অনুসন্ধান কণাপদার্থবিদ্যাতেই থেমে থাকেনি। তিনি কোয়ান্টাম ক্রোমোডায়নামিক্স -এর ভিত্তি গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। পরে তাঁর আগ্রহ ছড়িয়ে পড়ে আরও বিস্তৃত ক্ষেত্রে, বিশেষ করে জটিলতা নিয়ে গবেষণায়। ১৯৮৪ সালে তিনি সান্টা ফি ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীকালে জটিল তন্ত্র ও বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে আন্তঃবিষয়ক গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

গেল-মানের বৈজ্ঞানিক জীবন ছিল বিশৃঙ্খলার মধ্যে শৃঙ্খলা খোঁজার দীর্ঘ অভিযান। স্ট্রেঞ্জনেস থেকে অষ্টাঙ্গ পথ, সেখান থেকে কোয়ার্ক এবং পরে জটিলতা, প্রতিটি পর্যায়েই তিনি খুঁজেছেন প্রকৃতির দৃশ্যমান বৈচিত্র্যের পেছনের গভীর নিয়ম। তাঁর কাজ দেখিয়েছে, প্রকৃতিকে বাইরে থেকে যতই অগোছালো মনে হোক, তার গভীরে আছে অত্যন্ত সুন্দর, সংক্ষিপ্ত এবং শক্তিশালী গাণিতিক কাঠামো।

সূত্র: https://www.facebook.com/share/p/1Ee1ETGNG2/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × three =