সাধারণত পীতজ্বর মশার মাধ্যমে ছড়ায়। আর মশার বংশবিস্তারের জন্য প্রয়োজন জল। তাই অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। কিন্তু ২০১৭ সালে ব্রাজিলে তীব্র খরার মধ্যেই সেখানে দেখা দেয় পীতজ্বরের বড়সড় প্রাদুর্ভাব। ঘটনাটি নিছক কাকতালীয় কি না, তা খতিয়ে দেখতে শুরু করেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রোগ-বাস্তুবিদ জেমি ক্যালডওয়েল ও তাঁর সহকর্মীরা। ব্রাজিলে শহরাঞ্চলে এডিস ইজিপ্টাই মশার মাধ্যমে পীত জ্বরের সংক্রমণ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু তারপর আচমকা জঙ্গলে রোগটি ছড়িয়ে পড়ছিল মূলত হেমাগোগাস মশার মাধ্যমে। গবেষকদের প্রাথমিক অনুমান ছিল, তীব্র খরার কারণে জঙ্গলের বানররা জলের সন্ধানে শহরের কাছাকাছি চলে আসে। আর তাদের সঙ্গে বনাঞ্চলের মশারাও চলে আসে শহরের দিকে। ফলে সংক্রমিত প্রাণী, মশা এবং মানুষের মধ্যে যোগাযোগের সম্ভাবনা বাড়ে। এই অনুমান যাচাই করতে তাঁরা একটি গাণিতিক মডেল তৈরি করেন। মশা, হাওলার বানর, মার্মোসেট এবং মানুষের মধ্যে ভাইরাস কীভাবে ছড়াতে পারে, তার বিভিন্ন পরিস্থিতি মডেলে পরীক্ষা করা হয়। দেখা যায়, মশা ও বানর শহরের দিকে সরে এসেছে এবং শুষ্ক পরিবেশে মশা আরও ঘন ঘন মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে সংক্রমণ বাড়াচ্ছে – এমন পরিস্থিতি ধরে নিলে মডেলে তৈরি সংক্রমণের ঢেউ ২০১৭ সালের মিনাস জেরাইসের বাস্তব প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে প্রায় মিলে যায়। এর পর বাস্তব তথ্যও সেই অনুমানকে জোরদার করল। মশার নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, প্রাদুর্ভাবের মূল বাহক ছিল হেমাগোগাস – শহরের পরিচিত এডিস ইজিপ্টাই নয়। একই সময়ে শহর ও তার আশপাশে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি বানরের মৃতদেহও পাওয়া যাচ্ছিল। সব মিলিয়ে জঙ্গল থেকে বানর ও বনাঞ্চলের মশার শহরের দিকে সরে আসার সম্ভাবনাই জোরালো হয়ে ওঠে। তবে গবেষকেরা মনে করেন, খরা একাই এই প্রাদুর্ভাব ঘটায়নি। এর পেছনে আরও কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে। জলবায়ুর উষ্ণতা উল্টে মশার বংশবিস্তারে সহায়তা করে। বন উজাড়ের ফলে মানুষ ক্রমশ জঙ্গলের গভীরে প্রবেশ করতে শুরু করে। পীত জ্বরের ক্ষেত্রে একটি টিকাই আজীবন সুরক্ষা দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন পীত জ্বর নিয়ন্ত্রণে থাকায় মানুষের মধ্যে রোগটি নিয়ে উদ্বেগ কমে গিয়েছিল এবং টিকাকরণের হারও নেমে গিয়েছিল। অর্থাৎ, আগে থেকেই তৈরি হওয়া ঝুঁকিকে উস্কে দিয়েছে তীব্র খরা। এই ফলাফল জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। কোনও এলাকায় মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বেশি থাকলে খরার মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনকে আগাম সতর্কসংকেত হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। কারণ খরা ধীরে ধীরে তৈরি হয়, ফলে তার সুযোগ নিয়ে আগে থেকেই টিকাকরণ শুরু করা সম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তন, বনভূমিতে মানুষের ক্রমবর্ধমান প্রবেশ এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারিয়ে যাওয়ার ফলে ভবিষ্যতে রোগ ছড়ানোর এমন অপ্রত্যাশিত পথ আরও দেখা যেতে পারে। প্রকৃতি বদলাচ্ছে, আর তার সঙ্গে রোগজীবাণু ও তাদের বাহকরাও নিজেদের বদলে নিচ্ছে।
doi: 10.1126/science.z40s9te
