ভারতের প্রথম ফাস্ট-ব্রিডার রিঅ্যাক্টরের সাফল্য  

ভারতের প্রথম ফাস্ট-ব্রিডার রিঅ্যাক্টরের সাফল্য  

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২১ এপ্রিল, ২০২৬

ভারতের পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্থাপিত হয়েছে। দেশের প্রথম প্রোটোটাইপ ফাস্ট-ব্রিডার রিঅ্যাক্টর (PFBR) চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করেছে। ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই পারমাণবিক চুল্লিটি তামিলনাড়ুর কালপাক্কমে, চেন্নাই থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত বহু প্রতীক্ষিত একটি প্রকল্প। এটি ভবিষ্যতে ভারতের শক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে। এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের আরও ছয়টি ফাস্ট-ব্রিডার রিঅ্যাক্টরের পথপ্রদর্শক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বর্তমানে ভারতের মোট পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৯ গিগাওয়াট, যা মূলত ২৪টি প্রেসারাইজড হেভি ওয়াটার রিঅ্যাক্টর (PHWR)-এর ওপর নির্ভরশীল। এসব চুল্লিতে দেশীয় ও আমদানিকৃত প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম ব্যবহৃত হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে ভারত সরকার ২০৫০ সালের মধ্যে এই ক্ষমতা বাড়িয়ে ১০০ গিগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এতে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক শক্তির অংশ ৩% থেকে বেড়ে ১২%-এ পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে। যদিও একটি সংসদীয় প্যানেল সতর্ক করে বলেছে, বর্তমান সম্প্রসারণের গতি এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয় এবং দ্রুত উন্নয়নের জন্য নির্দিষ্ট তহবিল ও সুস্পষ্ট পথনির্দেশক মানচিত্রের প্রয়োজন।

PFBR-এর বিশেষত্ব হলো এর “ব্রিডিং’’ক্ষমতা, অর্থাৎ এটি যতটা জ্বালানি ব্যবহার করে তার চেয়ে বেশি জ্বালানি তৈরি করতে পারে। এতে ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়ামের মিশ্র অক্সাইড (MOX) জ্বালানি ব্যবহৃত হয়। রিঅ্যাক্টরের কেন্দ্রে নিউক্লীয় বিক্রিয়ার সময় নির্গত নিউট্রন চারপাশের ইউরেনিয়াম-২৩৮ স্তরে শোষিত হয়ে প্লুটোনিয়াম-২৩৯-এ রূপান্তরিত হয়, যা পরবর্তীতে আবার জ্বালানি হিসেবে কাজে লাগে। এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে জ্বালানির ঘাটতি অনেকটাই মেটাতে পারে।

২০০৪ সালে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও প্রযুক্তিগত জটিলতা ও বিলম্বের কারণে এটি নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে, ২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল প্রথম চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করে। প্রখ্যাত পারমাণবিক বিজ্ঞানী অনিল কাকোদকর একে ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

ভারতের পারমাণবিক কৌশল তিনটি ধাপে বিভক্ত। প্রথম ধাপে PHWR রিঅ্যাক্টর ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয় ধাপে এই রিঅ্যাক্টর থেকে উৎপন্ন ব্যবহৃত জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে MOX জ্বালানি তৈরি করে ফাস্ট-ব্রিডার রিঅ্যাক্টরে ব্যবহার করা হয়। তৃতীয় ধাপে দেশের বিপুল থোরিয়াম ভাণ্ডার কাজে লাগিয়ে ইউরেনিয়াম-২৩৩ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি শক্তির চাহিদা মেটাতে পারে।

তবে ফ্রান্স, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র প্রমুখ দেশ প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে ফাস্ট-ব্রিডার প্রকল্প থেকে সরে এসেছে বা গুরুত্ব কমিয়েছে। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি নির্ভর করবে ধাতব জ্বালানিভিত্তিক রিঅ্যাক্টরের ওপর, যা জ্বালানি উৎপাদনের সময় কমিয়ে আনতে পারে। একইসঙ্গে থোরিয়ামভিত্তিক উন্নত হেভি ওয়াটার রিঅ্যাক্টর (AHWR) উন্নয়নের মাধ্যমে ভারত তার পারমাণবিক শক্তির ভবিষ্যৎ আরও শক্তিশালী করতে চায়।

 

সূত্র: India’s first fast-breeder nuclear reactor achieves criticality, physics world, 15th April 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − ten =