ভারতে মানুষ – বন্যপ্রাণী সহাবস্থান 

ভারতে মানুষ – বন্যপ্রাণী সহাবস্থান 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৭ জুলাই, ২০২৬

একসময় ধারণা ছিল, বাঘ-চিতাবাঘ থাকবে জঙ্গলে, মানুষ থাকবে গ্রামে বা শহরে। কিন্তু সেই বিভাজন আজ আর বাস্তব নয়। বনভূমি ঘিরে গড়ে উঠেছে বসতি, রাস্তা ও কৃষিজমি। ফলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর পথ এখন প্রায়ই এক হয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলছে, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে মানুষ-প্রাণীর সহাবস্থানের বিপদও। বাঘ বা চিতাবাঘের মৃত্যুর খবর একজন বনকর্তার কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের খবর। কখনও এলাকা দখলের লড়াই, কখনও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, কখনো বা বিষপ্রয়োগ বা উদ্ধার অভিযানে প্রাণহানি। ঘটনাগুলি শুধু প্রাণীর মৃত্যু নয়, বরং দ্রুত বদলে যাওয়া পরিবেশে বন ব্যবস্থাপনার নতুন সংকটেরও ইঙ্গিত। তবে এই সংকটের পেছনে রয়েছে একটি ইতিবাচক দিকও। গত দু দশকে মধ্যপ্রদেশে বাঘ সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। সবচেয়ে বড় উদাহরণ পান্না টাইগার রিজার্ভ। ২০০৯ সালে এখান থেকে বাঘ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। পরিকল্পিত পুনর্বাসন, কঠোর নজরদারি এবং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় আজ সেখানে ৭০টিরও বেশি বাঘ রয়েছে। একইভাবে, দেওয়াস ও সেহোর জেলার খেওনি অভয়ারণ্যে কয়েক বছর আগে মাত্র দুটি বাঘ ছিল। এখন সেখানে বাঘের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২, যার মধ্যে শাবকও রয়েছে। অর্থাৎ, ছোট বনাঞ্চলও এখন গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থলে পরিণত হচ্ছে। এই সাফল্যের ফলে বাঘ এখন শুধু সংরক্ষিত বনেই সীমাবদ্ধ নেই। তারা কৃষিজমি, গ্রাম কিংবা খাস জমিতেও দেখা যাচ্ছে। ইন্দোর বিভাগের সাম্প্রতিক বাঘ গণনায় দেখা গেছে, ২০১৮ সালে যেখানে বাঘের উপস্থিতির কোনও চিহ্ন ছিল না, ২০২৬ সালে সেখানে ২১টি বনাঞ্চলে বাঘের উপস্থিতি মিলেছে। একই সময়ে চিতাবাঘের বিস্তারও বেড়েছে। ফলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান এখন আর ভবিষ্যতের ধারণা নয়, বরং প্রতিদিনের বাস্তবতা। এই বাস্তবতা মোকাবিলায় মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর বন বিভাগ ইন্টিগ্রেটেড হিউম্যান-ওয়াইল্ডলাইফ কো-এক্সিস্টেন্স মডেল (IHWCM) নামে নতুন এক উদ্যোগ নিয়েছে। যার মূল লক্ষ্য হলো সংঘাত কমানো এবং উদ্ধার, ক্ষতিপূরণ ও জনসচেতনতাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিভাগটি শত শত উদ্ধার অভিযান চালিয়েছে। চিতাবাঘ, নীলগাই, বানর, সাপসহ নানা প্রাণীকে নিরাপদে উদ্ধার করে বনাঞ্চলে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি অভিযানে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, পশুচিকিৎসা এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পুনর্বাসনের ওপর জোর দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দ্রুত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গবাদিপশু মারা গেলে বা মানুষ আহত হলে সময়মতো ক্ষতিপূরণ না পেলে অনেক সময় প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বন্যপ্রাণী হত্যা করা হয়। মধ্যপ্রদেশে ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়টি এখন নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করার আইনি ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রযুক্তিও ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠছে। ক্যামেরা ট্র্যাপ, থার্মাল ড্রোন, এম-স্ট্রাইপস (M-STrIPES) অ্যাপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে প্রাণীদের চলাচল ও সম্ভাব্য সংঘাতপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে। যদিও এসব প্রযুক্তি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে, তবু ভবিষ্যতে সংঘাত কমাতে এগুলোর বড় ভূমিকা থাকতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রযুক্তিই এর সমাধান নয়। বনরক্ষীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, উদ্ধারের সরঞ্জাম, পশুচিকিৎসক এবং আধুনিক যানবাহনের অভাব এখনও বড় সমস্যা। একই দলকে কখনও চিতাবাঘ উদ্ধার, কখনও সাপ ধরা, আবার কখনও জনতার চাপ সামলাতে হচ্ছে। ভারতে বাঘের সংখ্যা বাড়ছে, যা নিঃসন্দেহে সংরক্ষণের বড় সাফল্য। কিন্তু বনাঞ্চলের ধারণক্ষমতারও তো একটি সীমা রয়েছে। তাই এখন শুধু বাঘের সংখ্যা বাড়ানো নয়, মানুষ ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের বন ব্যবস্থাপনার সাফল্য নির্ভর করবে এমন একটি ভারসাম্যের ওপর, যেখানে মানুষ ও বন্যপ্রাণী—দু’পক্ষের নিরাপত্তা ও অস্তিত্বই সমান গুরুত্ব পাবে।

 

সূত্র: Down to Earth; July ; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × five =