সোশ্যাল মিডিয়া, ভিডিও আর নানা ধরনের ডিজিটাল কনটেন্টে আমাদের মনোযোগ আজ বিক্ষিপ্ত। ফলে অবসর সময়ে বই পড়ার অভ্যাসও কমছে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। এ সংক্রান্ত কতকগুলি গবেষণার ফলাফল থেকে কিছু সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে। নতুন এক পর্যালোচনা বলছে, আনন্দের জন্য বই পড়া শুধু সময় কাটানোর উপায় নয়, এটি মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। ছোটবেলা থেকে নিয়মিত বই পড়ার সঙ্গে মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভালো ক্ষমতা সম্পর্কযুক্ত। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি, বেশি ঘুম এবং কম সময় স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গেও পড়ার অভ্যাসের যোগ পাওয়া গেছে। ১০ হাজারের বেশি কিশোর-কিশোরীর উপর করা একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণাতে একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, পরিবারের আর্থিক অবস্থার প্রভাব নির্বিশেষে এই সুফল লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ বই পড়ার উপকার পেতে দামি কোনও সুযোগ-সুবিধার প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে ৮ থেকে ১৩ বছর বয়সী যেসব শিশুর পড়ার দক্ষতা ভালো, তাদের মস্তিষ্কের শ্বেত উপাদান অংশ তুলনামূলকভাবে সুসংগঠিত, তা মস্তিষ্কের বিভিন্ন এলাকার মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করতে সহায়ক। আবার লিখন-বৈকল্য বা ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের একটি ছোট গবেষণায় দেখা যায়, আট সপ্তাহ বই পড়ার প্রশিক্ষণের পর ভাষা ও স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের কিছু অংশে ধূসর পদার্থের পরিমাণও বাড়ে। শুধু শিশু নয়, বড়দের জন্যও বই পড়া উপকারী। ৪ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্কের উপর করা এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা আনন্দের জন্য বই পড়েন, তাদের মধ্যে সহমর্মিতা বেশি এবং মানসিক চাপ কম। বই অনেককে জীবনে নতুন কিছু করার অনুপ্রেরণাও দেয়- যেমন কেউ নতুন চাকরি খুঁজেছেন, কেউ ভ্রমণে গিয়েছেন, আবার কেউ নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া শুরু করেছেন। বয়স বাড়লেও বই পড়ার উপকার থামে না। ৫৫ বৎসরাধিক ৫,৪০০-রও বেশি সুস্থ মানুষের উপর করা আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, পড়া বা দাবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পরবর্তী পাঁচ বছরে স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি কমে যাওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম। আর প্রায় ২ হাজার প্রবীণকে নিয়ে ১৪ বছরের একটি গবেষণাতেও নিয়মিত বই পাঠকদের মধ্যে মানসিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার হার তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এর সঙ্গে যোগ হয় সামাজিক যোগাযোগের সুবিধাও। বয়স্কদের বুক ক্লাব বা যৌথ পাঠচক্রে অংশ নেওয়া একাকিত্ব কমাতে এবং অন্যদের সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। গবেষকদের মতে, সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতেও ভূমিকা পালন করতে পারে। অর্থাৎ, বই পড়া শুধু গল্পের জগতে নিয়ে যায় না, মনকে শান্ত রাখে, মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে চিন্তাশক্তি ধরে রাখতেও সাহায্য করতে পারে। তাই কিছুটা সময় স্ক্রিন থেকে দূরে থেকে হাতে বই তুলে নেওয়ার অভ্যাসটি নিছক বিনোদন নয়, নিজের যত্ন নেওয়ারও একটি সহজ উপায়।
সূত্র: Nautilus; September, 2026
