মস্তিষ্কে আত্মঘাতী চিন্তার জৈব নির্দেশক 

মস্তিষ্কে আত্মঘাতী চিন্তার জৈব নির্দেশক 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আচ্ছা, তীব্র আত্মঘাতী চিন্তা কি মস্তিষ্কে কোনো ছাপ রেখে যায়? উত্তরটা সম্ভবত হ্যাঁ। নেদারল্যান্ডস ইনস্টিটিউট ফর নিউরোসায়েন্সের বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কে P2RX7 নামের একটি গ্রাহী কোষের অস্বাভাবিক পরিবর্তন শনাক্ত করেছেন। যার কারণেই নাকি তীব্র আত্মহননের চিন্তা মাথায় বারবার ঘোরে। কোষের চাপ, প্রদাহ ও শক্তি বিপাকের প্রতিক্রিয়াতেও এই গ্রাহী কোষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে।

গবেষক লিন ঝাং নেদারল্যান্ডস ব্রেন ব্যাংকে সংরক্ষিত মৃত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের কোষকলা পরীক্ষা করেন। প্রথমে তাঁরা মেজাজ নিয়ে সমস্যায় থাকা ও না-থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে তুলনা করেন। কিন্তু এতে স্পষ্ট কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি। পরে মৃত্যুর কারণের ভিত্তিতে নমুনাগুলো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সামনে আসে।

নেদারল্যান্ডস ব্রেন ব্যাংকের মস্তিষ্কের টিস্যু বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেন,আত্মহত্যা বা স্বেচ্ছামৃত্যুতে মৃতদের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষে P2RX7-এর মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। বিপরীতে, স্বাভাবিক কারণে মৃতদের ক্ষেত্রে এই মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। এখানে আশ্চর্যের বিষয় হল, এই পার্থক্যটি ব্যক্তির মেজাজ সংক্রান্ত কোনো সমস্যার

ওপর নির্ভরশীল নয়। এর থেকে গবেষকদের ধারণা হয়েছে , আত্মহত্যার চিন্তা বেশি করলে মস্তিষ্কের যে পরিবর্তনটা ঘটে আর কেউ চরম বিষণ্ণতায় ভুগলে যে পরিবর্তনটা ঘটে, সেটার ধরণ কিছুটা আলাদা হয়।

তবে গবেষণার আরও একটি বিশেষ দিক রয়েছে। কয়েকজন ব্যক্তি অতীতে আত্মহত্যার চিন্তা করেছিলেন বা করতে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পরে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। মৃত্যুর সময় তাঁদের মস্তিষ্কে P2RX7-এর মাত্রা কিন্তু বেশি ছিল না। এতে বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, আত্মহত্যার তীব্র চিন্তার সময়ে P2RX7 বেড়ে যেতে পারে এবং সুস্থতার সঙ্গে সঙ্গে সেটা আবার কমেও যেতে পারে।

অবশ্য এটি এখনো একটি সম্ভাব্য ধারণা, কোনো প্রমাণিত সত্য নয়। কারণ মস্তিষ্কের টিস্যু একবারের বেশি পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তাই P2RX7-এর মাত্রা সত্যিই আত্মহত্যার চিন্তার তীব্রতার সঙ্গে ওঠানামা করে কি না, তা জানা যায়নি।

এবার গবেষকদের ইচ্ছা , তাঁরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবেন জীবিত মানুষের মধ্যে। মানে, গবেষণার পরবর্তী ধাপে আমস্টারডম UMC-এর গবেষকরা জীবিত মানুষের মস্তিষ্কে PET ইমেজিংয়ের মাধ্যমে P2RX7-সম্পর্কিত সংকেত পরীক্ষা করবেন। যদি জীবিত ব্যক্তিদের মধ্যেও একই প্রবণতাই দেখা যায়, তাহলে নিশ্চিতরূপে ভবিষ্যতে এটি আত্মহননমূলক চিন্তার উপস্থিতি বা পরিবর্তন বোঝার একটি সম্ভাব্য জৈব নির্দেশক হবে।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা শুধুমাত্র আত্মহত্যার ঝুঁকি শনাক্ত করা নয়। বরং কীভাবে মানুষ আত্মহত্যার তীব্র চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসে, সেই সহনশীলতার জৈবিক রহস্য বোঝা।

আপাতত গবেষণাটি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। P2RX7 সত্যিই আত্মহননমূলক চিন্তার নির্ভরযোগ্য সূচক কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

 

সূত্র: “N-terminal epitope of P2X purinoceptor 7 in the human hippocampal dentate gyrus differs in suicide and resilience for suicide” by Lin Zhang, J. Alexander Heimel and Dick F. Swaab, 23 July 2026, The British Journal of Psychiatry.

DOI: 10.1192/bjp.2026.10717

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 − fourteen =