প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বলতে তেমন কিছুই ছিল না। ছোটবেলায় বই বাঁধাইয়ের কাজ শিখেছিলেন। আর সেই বইয়ের পাতার মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন নিজের শিক্ষক-কে। কৌতূহল আর একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষার হাত ধরে মাইকেল ফ্যারাডে হয়ে উঠেছিলেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানী। ২২ সেপ্টেম্বর ১৭৯১। লন্ডনের সাউথওয়ার্কের নিউিংটন বাটসে জন্ম মাইকেল ফ্যারাডের। বাবা জেমস ফ্যারাডে ছিলেন কামার। পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। ফলে উচ্চশিক্ষার সুযোগও পাননি তিনি। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তাঁকে বই বাঁধাইয়ের কাজে লেগে পড়তে হয়। বই বাঁধতে গিয়ে বই পড়ার সুযোগ পেতেন। বিজ্ঞানের বই পড়তে পড়তেই তৈরি হয় তাঁর আগ্রহ। বিশেষ করে জেন মার্কেটের ‘কনভারসেশনস অন কেমিস্ট্রি’ বইটি তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
১৮১২ সালে বাঁধাই খানার এক গ্রাহক উইলিয়াম ড্যান্স, তাঁকে বিজ্ঞানী হামফ্রি ডেভির রয়্যাল ইনস্টিটিউশনের বক্তৃতা শোনার সুযোগ করে দেন। বক্তৃতাগুলির বিস্তারিত নোট নেন ফ্যারাডে। সেগুলি সুন্দর করে বাঁধাই করে ডেভির কাছে পাঠান। সেই কাজ নজরে পড়ে ডেভির। পরের বছরই রয়্যাল ইনস্টিটিউশনে রাসায়নিক সহকারী হিসেবে যোগ দেন ফ্যারাডে। তাঁর গবেষণার শুরুটা ছিল মূলত রসায়ন দিয়ে। ক্লোরিন ও কার্বন-যৌগ নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি গ্যাসকে তরলে পরিণত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করেন তিনি। ১৮২৫ সালে ‘পোর্টেবল গ্যাস’-এর তৈলাক্ত অবশিষ্টাংশ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে একটি নতুন হাইড্রোকার্বন আলাদা করেন। পরে সেটিই বেনজিন নামে পরিচিত হয়। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান আসতে চলেছিল অন্য জায়গায়-বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্বে। ১৮২০ সালে হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান ওরস্টেড দেখিয়েছিলেন, বৈদ্যুতিক প্রবাহ চুম্বক শলাকাকে প্রভাবিত করতে পারে। ফ্যারাডে তখন বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্বের সম্পর্ক নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেন। ১৮২১ সালে তিনি প্রদর্শন করেন তড়িৎ চুম্বকীয় ঘূর্ণন। এর মধ্যেই নিহিত ছিল বৈদ্যুতিক মোটরের মূল নীতি। ১৮৩১ সালে আসে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার—তড়িৎচৌম্বকীয় আবেশ। পরিবর্তনশীল চৌম্বক ক্ষেত্র থেকে বৈদ্যুতিক প্রবাহ তৈরি করা সম্ভব, পরীক্ষার মাধ্যমে সেটিই দেখান ফ্যারাডে। আজকের জেনারেটর ও ট্রান্সফরমারের পিছনে যে নীতি কাজ করে, তার অন্যতম ভিত্তি এই আবিষ্কার।
ফ্যারাডের গবেষণার আরেকটি বড় ক্ষেত্র ছিল তড়িৎ বিশ্লেষণ। ১৮৩৩–৩৪ সালে তাঁর কাজ থেকেই তৈরি হয় তড়িৎ বিশ্লেষণের সূত্র। কেমব্রিজের পণ্ডিত উইলিয়াম হুইলের সঙ্গে কাজ করে তিনি এমন কিছু বৈজ্ঞানিক পরিভাষার প্রচলনেও ভূমিকা রাখেন, যেগুলি আজও ব্যবহার করা হয়- ইলেকট্রোড, অ্যানোড, ক্যাথোড ও আয়ন। ১৮৩৬ সালে তাঁর আরেকটি পরীক্ষার ফল সামনে আসে। কোনও পরিবাহী আবরণ বাইরের বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র থেকে তার ভিতরের অংশকে সুরক্ষিত রাখতে পারে। এই নীতিই পরে ‘ফ্যারাডে কেজ’ (তড়িৎ-আবরণী খাঁচা) নামে পরিচিত হয়। তারপর ১৮৪৫। আবারও এক বড় আবিষ্কার। ফ্যারাডে ডায়াম্যাগনেটিজম এবং পরে তাঁর নামে পরিচিত ‘ফ্যারাডে প্রভাব’ (Faraday effect) আবিষ্কার করেন। চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবে কোনও পদার্থের মধ্য দিয়ে যাওয়া আলোর অববর্তনের তল ঘুরে যেতে পারে। এর মাধ্যমে আলো ও তড়িৎচুম্বকত্বের মধ্যে যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে, তার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক প্রমাণ পাওয়া যায়।
ফ্যারাডের ভাবনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল তাঁর ‘lines of force’ বা বলরেখার ধারণা। চুম্বকের চারপাশে লোহার গুঁড়ো ছড়িয়ে তিনি যে নকশা দেখাতেন, সেটিকে তিনি শুধু সুন্দর একটি পরীক্ষার ফল হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে এগুলি ছিল বৈদ্যুতিক ও চৌম্বকীয় ক্রিয়ার ভৌত উপস্থিতির ছবি। পরে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল ফ্যারাডের এই ধারণাগুলিকে গণিতের ভাষায় প্রকাশ করেন এবং সেগুলিকে আরও বিস্তৃত করেন। আধুনিক তড়িৎচৌম্বকীয় তত্ত্বের ইতিহাসে সেটি হয়ে ওঠে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তবে ফ্যারাডে শুধু গবেষণাগারে আটকে থাকা বিজ্ঞানী ছিলেন না। সাধারণ মানুষের কাছে বিজ্ঞানকে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। রয়্যাল ইনস্টিটিউশনের ‘শুক্রবার সন্ধ্যার বক্তৃতামালা’ এবং বিখ্যাত ‘ক্রিসমাস লেকচারস’-এর সঙ্গেও তাঁর গভীর যোগ ছিল। বড় বড় আবিষ্কারের পরেও সম্পদ বা সামাজিক মর্যাদা তাঁর কাছে মুখ্য হয়ে ওঠেনি। নিজের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলির জন্য তিনি কোনও পেটেন্টও নেননি। রয়্যাল সোসাইটির সভাপতির পদ দু’বার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। নাইটহুডও গ্রহণ করতে চাননি বলে প্রচলিত আছে, যদিও তাঁকে সত্যিই এমন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল কি না, তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
১৮৬৭ সালের ২৫ আগস্ট হ্যাম্পটন কোর্টে মারা যান ফ্যারাডে। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী হাইগেট সেমেট্রির অসংরক্ষিত অংশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। আজও বিজ্ঞানের নানা জায়গায় তাঁর নাম বেঁচে আছে- ধারকত্বের একক ‘ফ্যারাড’, ‘ফ্যারাডে ধ্রুবক’, ‘ফ্যারাডে প্রভাব’ এবং ‘ফ্যারাডে কেজ’-এর মধ্যে। আলবার্ট আইনস্টাইনের পড়ার ঘরেও নিউটন, ফ্যারাডে ও ম্যাক্সওয়েলের ছবি থাকত। ফ্যারাডের জীবন আসলে দেখায়, বিজ্ঞান শুধু বড় বড় প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরিতে তৈরি হয় না। কখনও কখনও একটি বই, একটি বক্তৃতা আর অসীম কৌতূহলও একজন মানুষের সামনে খুলে দিতে পারে গোটা বিজ্ঞানের নতুন দরজা।
