সম্প্রতি ভারতীয় উষ্ণমণ্ডলীয় আবহাওয়া গবেষণা প্রতিষ্ঠান (IITM), পুনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমঘাট অঞ্চলে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মৌসুমি বৃষ্টির গড়ে প্রায় ২৫ শতাংশ বৃষ্টির জল মাঝ আকাশেই বাষ্পে পরিণত হয়। গবেষণাটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান পত্রিকা অ্যাটমোস্ফেরিক কেমিস্ট্রি অ্যান্ড ফিজিক্সে-এ প্রকাশিত হয়েছে। ভারতে পরীক্ষার মাধ্যমে এই ধরনের পরিমাপ এই প্রথম।
গবেষণাপত্রটির প্রধান লেখক সৈকত সেনগুপ্ত জানান, প্রতিদিন এই বাষ্পীভবনের হার এক রকম থাকে না। কোনো দিনে তা মাত্র ৪ শতাংশ, আবার কোনো দিনে ৬১ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ভবিষ্যতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে একই ধরনের পরিমাপ করা সম্ভব হবে বলে গবেষকদের আশা। কারণ রাজস্থানের শুষ্ক আবহাওয়া, পশ্চিমঘাটের আর্দ্র পরিবেশ বা উত্তর-পূর্ব ভারতের জলবায়ু— বিভিন্ন জায়গায় এই হার ভিন্ন হতে পারে।
বৃষ্টির জল মাঝপথে বাষ্প হয়ে যাওয়াটা আবহাওয়া ও জলবায়ুর ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। বৃষ্টির ফোঁটা নীচে নামার সময় যখন আংশিকভাবে বাষ্পীভূত হয়, তখন তা আশপাশের বাতাস থেকে তাপ শোষণ করে। এর ফলে মেঘের নীচের স্তরের বাতাস ঠান্ডা হয়ে যায় এবং নীচের দিকে ঠান্ডা বায়ুপ্রবাহ তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়া নতুন মেঘ সৃষ্টি, বজ্রঝড়ের বিকাশ এবং পরবর্তী বৃষ্টিপাতকে প্রভাবিত করে। তাই এই তথ্য সঠিকভাবে জানা থাকলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং জলবায়ু মডেলের নির্ভুলতা আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ভারতের এই ২৫ শতাংশ বাষ্পীভবনের হার বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম। উপগ্রহভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ বৃষ্টি মাঝপথে বাষ্প হয়ে যায়। সুইজারল্যান্ডের জুরিখে এই হার প্রায় ৪০ শতাংশ এবং ক্যারিবীয় দ্বীপ বার্বাডোসে প্রায় ৬০ শতাংশ। এর প্রধান কারণ হলো বৃষ্টির ফোঁটার আকার এবং বাতাসের আর্দ্রতার পার্থক্য। ছোট ফোঁটা ও শুষ্ক বাতাসে বাষ্পীভবন বেশি হয়, আর বড় ফোঁটার ভারী বর্ষণে এই প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা একটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক কৌশল ব্যবহার করেছেন, যাকে আইসোটোপ বিশ্লেষণ বলা হয়। সাধারণ জলের সঙ্গে সামান্য পরিমাণে ভারী অক্সিজেন বা ভারী হাইড্রোজেনযুক্ত জলের অণুও থাকে। বৃষ্টির ফোঁটা বাষ্পীভূত হওয়ার সময় হালকা অণুগুলো আগে উড়ে যায় এবং ভারী অণুগুলো ফোঁটার মধ্যে থেকে যায়। ফলে বৃষ্টির জলে ভারী আইসোটোপের পরিমাণ বিশ্লেষণ করে বোঝা যায়, কতটা জল মাঝ আকাশে বাষ্প হয়ে গেছে। ২০১৯ সালের বর্ষায় পুনেতে বিজ্ঞানীরা বৃষ্টির জল ও বায়ুমণ্ডলের জলীয়বাষ্প সংগ্রহ করে লেজার স্পেকট্রোমিটারের সাহায্যে আইসোটোপের অনুপাত নির্ণয় করেন। পরে সেই তথ্য একটি বিশেষ কম্পিউটার মডেলে বিশ্লেষণ করে বৃষ্টির ফোঁটার বাষ্পীভবনের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে আইআইটিএম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও উন্নত যন্ত্র বসিয়ে এই গবেষণা সম্প্রসারণের কাজ করছে।
গবেষকদের মতে, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝপথে বৃষ্টির বাষ্পীভবনের সঠিক পরিমাণ জানা গেলে মৌসুমি বৃষ্টির প্রকৃতি, বজ্রঝড়ের সৃষ্টি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের আবহাওয়ার আরও নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দেওয়া যাবে।
সূত্রঃ https://www.thehindu.com/news/national/one-fourth-of-indias-monsoon-rain-evaporates-mid-air-says-new-study/article71210939.ece/amp/
