মানুষ কেন দানব হতে পারে না

মানুষ কেন দানব হতে পারে না

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ২৯ আগষ্ট, ২০২৬

পুরাণ, লোককথা থেকে শুরু করে কল্পকাহিনীর কোথাও না কোথাও দৈত্যের উপস্থিতি থাকবেই। গ্রিক মহাকাব্য ওডিসির সাইক্লপস থেকে শুরু করে মহাভারতের বক রাক্ষস কিংবা ঘটোৎকচ — সবাই মানুষের মতো দেখতে, মানুষের মতো হাঁটে, দৌড়ায়, বেশ ভারী ওজন তোলে এবং লড়াই করে। পার্থক্য হল তারা মানুষের তুলনায় আকারে অনেক বড়। কিন্তু কথা হলো, বাস্তবে কি মানুষের মতো শরীর নিয়ে কোনো বিশাল দৈত্য বেঁচে থাকতে পারে? পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী , একই অনুপাত বজায় রেখে মানুষের ঐ বিশাল আকার এবং ওজন একই সাথে বজায় রাখা সম্ভব নয়।

এর কারণটা অবশ্য আজ থেকে প্রায় চারশো বছর আগে ইতালীয় বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলেই ব্যাখ্যা করেছিলেন। ১৬৩৮ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘Dialogues Concerning Two New Sciences’ গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছিলেন, কোনো বস্তুর আকার বাড়লে তার শক্তি ও ওজন একই হারে বাড়ে না। এই সহজ গাণিতিক পার্থক্যই দৈত্যের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

বিষয়টিকে আরেকটু সহজ করে বোঝার জন্য গ্যালিলিও একটি কাঠের বিমের উদাহরণ দিয়েছিলেন। ধরা যাক, একটি শক্ত কাঠের বিম কোনো ভার বহন করছে। এবার একই উপাদান ও একই অনুপাত বজায় রেখে সেটিকে ১০ গুণ বড় করা হলো। বিমটির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও পুরুত্ব—সবই ১০ গুণ হল। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিমের ভার বহনের ক্ষমতা নির্ভর করে তার ক্রস-সেকশন বা প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলের ওপর। ক্ষেত্রফল দৈর্ঘ্যের বর্গের সঙ্গে বাড়ে। তাই বিমের আকার ১০ গুণ হলে তার শক্তি প্রায় ১০০ গুণ বাড়বে। কিন্তু বিপদ হয় ওজনের ক্ষেত্রে। কোনো বস্তুর ভর নির্ভর করে তার আয়তনের ওপর। আর আয়তন দৈর্ঘ্যের ঘনের সঙ্গে বাড়ে। ফলে কোনো বস্তু ১০ গুণ বড় করলে তার আয়তন ও ভর ১০০০ গুণ হয়ে যায়।

অর্থাৎ, একটি বিমকে ১০ গুণ বড় করলে তার শক্তি বাড়ে ১০০ গুণ, কিন্তু তার ওজন বাড়ে ১০০০ গুণ। ফলে বড় বিমটি নিজের তুলনায় অনেক বেশি ওজন বহন করতে পারে না। একসময় এমন পর্যায় আসে যখন বিমটি বাইরের কোনো ভার ছাড়া নিজের ওজনেই ভেঙে পড়তে পারে।

মানুষের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। ধরা যাক, মানুষের হাড় এখানে শরীরের কাঠামোগত বিম। কারণ মানবদেহের হাড়ই শরীরের ওজন, পেশি ও অন্যান্য টিস্যুর ভার বহন করে। যদি একজন সাধারণ মানুষের শরীরকে একই অনুপাতে ১০ গুণ বড় করা হয়, তাহলে তার হাড়ের শক্তি প্রায় ১০০ গুণ বাড়বে, কিন্তু শরীরের ভর বাড়বে প্রায় ১০০০ গুণ। অর্থাৎ শরীরের ওজন তার হাড়ের শক্তির তুলনায় অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।

ফলে এমন দৈত্যের পা ও হাড়ের অনুপাত সাধারণ মানুষের মতো হলে সেগুলো তার শরীরকে ধরে রাখতে পারবে না। হয় তার অনেক বেশি শক্তিশালী উপাদানের হাড় থাকতে হবে, অথবা তার শরীরের গঠন বদলাতে হবে। অর্থাৎ বাস্তব প্রাণীকে বড় হতে হলে শুধু সবকিছুকে একই অনুপাতে বড় করলে চলবে না; তাকে তুলনামূলকভাবে মোটা ও শক্তিশালী অঙ্গ তৈরি করতে হবে।

প্রকৃতির প্রাণীদের মধ্যেই এর অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। হাতি, গণ্ডার ও জলহস্তীর মতো বড় প্রাণীদের পা শরীরের তুলনায় অনেক মোটা ও শক্তিশালী। অন্যদিকে বিড়াল, কুকুর বা ছোট প্রাণীদের পা তুলনামূলকভাবে সরু। কারণ বড় প্রাণীর ক্ষেত্রে শরীরের ওজন দ্রুত বাড়ে, তাই তাকে সেই অতিরিক্ত ওজন সামলাতে আরও শক্তিশালী কাঠামো দরকার।

ডাইনোসরদের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। বিশাল আকারের প্রাণীদের শরীরের কাঠামো তাদের আকার অনুযায়ী বিশেষভাবে অভিযোজিত হয়েছিল। তাই প্রকৃতির বড় প্রাণীকে কোনো ছোট প্রাণীর নিখুঁত বড় সংস্করণ হিসেবে দেখা যায় না।

আকার ছোট করলেও একইভাবে অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে। কোনো প্রাণীকে যদি ১০ গুণ ছোট করা হয়, তার শক্তি কমে প্রায় ১০০ গুণ, কিন্তু ভর কমে প্রায় ১০০০ গুণ। ফলে ছোট প্রাণীর আপেক্ষিক শক্তি অনেক বেশি হয়। এ কারণেই ছোট প্রাণী নিজের শরীরের ওজনের তুলনায় অনেক বেশি ভার বহন করতে পারে।

পোকামাকড় এর চমৎকার উদাহরণ। তাদের সরু পা মানুষের আকারে বড় করলে শরীরের ওজন সামলাতে পারত না। কিন্তু ছোট আকারে তাদের ভর এত কম যে সেই সরু পা যথেষ্ট শক্তিশালী। অনেক পোকা নিজেদের উচ্চতার তুলনায় বহু গুণ বেশি লাফ দিতে পারে। তারা দেয়াল ও ছাদেও হাঁটতে পারে। কারণ তাদের ছোট আকার, স্থিরতড়িৎ আকর্ষণের মতো ক্ষুদ্র শক্তিগুলোও শরীরকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

জলের উপর হাঁটতে পারে এমন কিছু জলজ পোকাও আকারের এই প্রভাবের উদাহরণ। ছোট আকারে জলের পৃষ্ঠটান তাদের ওজন ধরে রাখতে পারে। কিন্তু একই পোকাকে অনেক বড় করলে তার ওজন এত বেড়ে যাবে যে পৃষ্ঠটান আর তাকে ভাসিয়ে রাখতে পারবে না।

এই কারণেই কল্পকাহিনীর ক্ষুদ্র মানুষ বা লিলিপুটিয়ানদের ক্ষেত্রেও বাস্তবতার সমস্যা রয়েছে। Gulliver’s Travels-এর ছয় ইঞ্চি উচ্চতার মানুষের মতো প্রাণী যদি সাধারণ মানুষের নিখুঁত ছোট সংস্করণ হতো, তাহলে তাদের শক্তি ও পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। তারা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ভার বহন করতে পারত এবং অনেক উঁচুতে লাফ দিতে পারত। কিন্তু একই সঙ্গে জলের পৃষ্ঠটান ও স্থিরতড়িৎ আকর্ষণের মতো ক্ষুদ্র শক্তিগুলো তাদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলত।

আকারের এই নিয়ম প্রাণীর বিবর্তনকেও প্রভাবিত করে। পৃথিবীর ইতিহাসে বহু প্রাণীর আকার সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। প্রাচীনকালের ঘোড়া বর্তমান ঘোড়ার তুলনায় অনেক ছোট ছিল। আবার প্রাগৈতিহাসিক যুগের কিছু পতঙ্গ বর্তমান পতঙ্গের তুলনায় অনেক বড় ছিল। কিন্তু বিবর্তন কখনো শুধু শরীরের প্রতিটি অংশকে একই অনুপাতে বড় বা ছোট করে না। বরং প্রাণীর আকার পরিবর্তনের সঙ্গে হাড়, পা, পেশি, শরীরের আকৃতি ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যও পরিবর্তিত হয়।

গ্যালিলিওর পর্যবেক্ষণের মূল বিষয় হলো—প্রকৃতিতে আকার পরিবর্তনের সঙ্গে সবকিছু একই নিয়মে পরিবর্তিত হয় না। শক্তি মূলত ক্ষেত্রফলের সঙ্গে এবং ভর আয়তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভর শক্তির চেয়ে দ্রুত বাড়ে। আবার আকার কমলে তুলনামূলকভাবে শক্তি বেড়ে যায়।

এই সাধারণ গাণিতিক নিয়মই ব্যাখ্যা করে কেন মানুষের মতো বিশাল দৈত্য বাস্তবে থাকা সম্ভব নয়, কেন প্রকৃতির বড় প্রাণীদের শরীরের গঠন ছোট প্রাণীদের তুলনায় আলাদা। একই কারণে লিলিপুটিয়ান বা ক্ষুদ্র মানুষের কল্পনাও বাস্তব পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

অতএব, দৈত্য বা ক্ষুদ্র মানুষের গল্প সাহিত্য ও কল্পনার জগতে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তব পৃথিবীতে আকারের কঠোর সীমা রয়েছে। আমাদের শরীর যে আকারে গড়ে উঠেছে, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। শরীরের হাড়, পেশি, ওজন এবং কাঠামোর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রয়েছে। পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম সেই ভারসাম্যকেই নির্ধারণ করে। আর সেই কারণেই মানুষ ঠিক বর্তমান আকার নিয়েই টিকে থাকতে সক্ষম।

 

সূত্র: Why Human Giants Defy the Laws of Physics | The MIT Press Reader

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four + 14 =