কুকুর মানুষের মনের কথা আক্ষরিক অর্থে পড়তে পারে না ঠিকই, কিন্তু মানুষের আবেগ, আচরণ ও শারীরিক সংকেত বোঝার ক্ষেত্রে তারা অত্যন্ত দক্ষ। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের সঙ্গে সহাবস্থান ও বিবর্তনের ফলে কুকুরের মস্তিষ্ক এমনভাবে অভিযোজিত হয়েছে যে তারা আমাদের কণ্ঠস্বর, মুখের অভিব্যক্তি, শরীরের ভঙ্গি এমনকি শরীরের গন্ধ থেকেও আবেগের পরিবর্তন বুঝতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, কুকুরের মস্তিষ্কে মানুষের মতোই কণ্ঠস্বর শনাক্ত করার জন্য বিশেষ অঞ্চল রয়েছে। মানুষের হাসি, কান্না বা রাগী চিৎকারের মতো আবেগপূর্ণ শব্দ কুকুরের মস্তিষ্কের শ্রবণ-অঞ্চল এবং অ্যামিগডালাকে সক্রিয় করে। অর্থাৎ তারা শুধু আমরা কী বলছি তা নয়, কীভাবে বলছি এবং তার মধ্যে কী আবেগ রয়েছে, সেটিও বুঝতে পারে।
মানুষের মুখও কুকুরের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। পরিচিত মানুষের মুখ দেখলে তাদের মস্তিষ্কের আবেগ-সম্পর্কিত অংশটি সক্রিয় হয়। এমনকি তারা হাসিমুখ ও রাগী মুখের পার্থক্যও করতে পারে। মানুষের মতো কুকুরও আবেগপূর্ণ মুখ বিশ্লেষণের সময় মুখের নির্দিষ্ট দিকের দিকে বেশি নজর দেয়।
কুকুরের সঙ্গে মানুষের আবেগগত সম্পর্কের অন্যতম চমকপ্রদ দিক হলো অক্সিটোসিন, যাকে ভালোবাসার হরমোন বলা হয়। মানুষ ও কুকুর যখন একে অপরের চোখের দিকে স্নেহভরে তাকায়, তখন উভয়ের শরীরেই অক্সিটোসিনের মাত্রা বাড়তে পারে। এই রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া পারস্পরিক বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের সঙ্গে এই ধরণের প্রতিক্রিয়া পোষা কুকুরের মধ্যে বিশেষভাবে বিকশিত হয়েছে; মানুষের সংস্পর্শে বড় করা নেকড়েদের মধ্যে কিন্তু একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
কুকুর শুধু আমাদের আবেগ বুঝতেই পারে না, কখনও কখনও সেই আবেগ নিজেদের মধ্যেও প্রতিফলিত করে। একে বলা হয় ‘emotional contagion’ বা আবেগের সংক্রমণ। মানসিক চাপের সময় কিছু কুকুর ও মানুষের হৃদস্পন্দনের মধ্যেও সামঞ্জস্য দেখা গেছে। আবার ভীত মানুষের ঘামের গন্ধ কুকুরের মধ্যে বেশি চাপের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ মানুষের উদ্বেগের গন্ধও কুকুরের আচরণকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। কুকুরের
এই অসাধারণ ক্ষমতার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ বিবর্তনীয় ইতিহাস। গৃহপালনের প্রক্রিয়ায় মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সামাজিক আচরণকারী প্রাণীদের বেছে নেওয়া হয়েছে। রাশিয়ার শিয়াল-গৃহপালন পরীক্ষাও দেখিয়েছে, বেশি শান্ত ও মানুষের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ প্রাণীদের মস্তিষ্কে আবেগ ও পুরস্কার-সম্পর্কিত পরিবর্তন ঘটতে পারে।
তাই কুকুর হয়তো জানে না কেন আমরা দুঃখিত বা আমাদের মনে ঠিক কী চলছে; কিন্তু আমাদের কণ্ঠস্বর, মুখ, শরীরের ভাষা ও গন্ধ থেকে তারা আবেগের সংকেত অসাধারণ দক্ষতায় ধরতে পারে। এই কারণেই কুকুর মানুষের মন পড়তে না পারলেও আবেগ বুঝে পাশে থাকার ক্ষেত্রে অন্য অনেক প্রাণীর চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ।
সূত্র:https://phys.org/news/2025-08-dog-mind.html
