মা হওয়া কি মুখের কথা ! 

মা হওয়া কি মুখের কথা ! 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৬ জুন, ২০২৬

সন্তান জন্ম দেওয়ার আগে সমাজ নারীর মনে কিছু নির্দিষ্ট বার্তা গেঁথে দেয়। যেমন “স্বাভাবিক প্রসবই সবচেয়ে ভালো”, “শরীর নিজেই জানে কী করতে হবে”, কিংবা “অস্ত্রোপচার ছাড়া সন্তান জন্ম দেওয়াই একজন মায়ের সাফল্য”। পরিবার, প্রসব-পূর্ব প্রশিক্ষণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্বাস্থ্যসেবার নানা পরামর্শের মাধ্যমে এই ধারণা এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে অনেক হবু মা এটিকেই মাতৃত্বের আদর্শ মানদণ্ড হিসেবে দেখতে শুরু করেন।

কিন্তু নতুন এক গবেষণায় দেখাযাচ্ছে, এই প্রত্যাশাই অনেক সময় নারীদের গভীর মানসিক আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে যখন প্রসব বাস্তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী না হয়।

যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত গবেষণায় প্রথমবারের মতো মা হওয়া ২১ জন নারীর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেখা গেছে, তাদের প্রত্যেকের প্রসব কোনো না কোনোভাবে প্রত্যাশিত পথের বাইরে হয়েছিল। কারও জরুরিকালীন সিজার করতে হয়েছে, কারও ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়েছে, আবার কারও প্রসব পরিকল্পনা সম্পূর্ণ বদলে গেছে।

এই গবেষণা থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি জানা গেছে তা হলো, মানসিক কষ্টের মূল উৎস সবসময় প্রসবের চিকিৎসাগত জটিলতা নয়। বরং বড় আঘাত আসে তখন, যখন বহুদিনের লালিত “আদর্শ প্রসবের” স্বপ্ন ভেঙে যায়। অনেক নারী মনে করেন, স্বাভাবিক ও ওষুধবিহীন প্রসবই একজন ভালো মা হওয়ার প্রথম ধাপ। ফলে বাস্তবতা অন্যরকম হলে তারা সেটিকে চিকিৎসাগত পরিস্থিতি হিসেবে নয়, ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখেন।

গবেষকরা বলেন, গর্ভাবস্থার সময় নারীদের মনে একটি “আদর্শ মায়ের প্রতিচ্ছবি” তৈরি করা হয়। সেখানে স্বাভাবিক প্রসব, শিশুকে স্তন্যপান করানো এবং জন্মের পরপরই নিখুঁত মা-শিশু বন্ধন গড়ে তোলাকে মাতৃত্বের সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু বাস্তবে সন্তান জন্মদান একটি অত্যন্ত জটিল জৈবিক প্রক্রিয়া, যেখানে নিরাপত্তা ও সুস্থতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কিভাবে সন্তানের জন্ম হচ্ছে সেটা বড় কথা নয়।

এই গবেষণায় অংশ নেওয়া এক মা, যাঁর শেষ পর্যন্ত অপ্রত্যাশিত সিজার করতে হয়েছিল, তার মনের মধ্যে একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছিল—“যে শরীর সন্তানকে বড় করেছে, সেই শরীর কেন তাকে জন্ম দিতে পারল না?” এই প্রশ্ন শুধু হতাশার নয়; এটি সেই গভীর আত্মদোষারোপের প্রতিফলন, যা অনেক নারী অনুভব করেন। এমনকি এক নারী, যিনি জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নিজের ও সন্তানের জীবন রক্ষা করেছিলেন, তিনিও মনে করেছিলেন যে তিনি যেন ঠিকভাবে সন্তান জন্ম দিতে পারেননি।

এই মানসিক চাপ অনেক সময় মা ও সন্তানের সম্পর্ক নিয়েও অযথা ভয় তৈরি করে। জন্মের পর প্রথম ঘণ্টায় শিশুর ত্বকের সঙ্গে সংস্পর্শ না হলে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এমন ধারণা অনেকের মধ্যে এতটাই পোক্তভাবে গেড়ে বসে যে বাস্তবে সুস্থ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তারা দীর্ঘদিন অপরাধবোধে ভোগেন।

গবেষকদের মতে, পরিবর্তন শুরু হওয়া উচিত প্রসব-পূর্ব শিক্ষা ও পরামর্শের ভাষা থেকে। স্বাভাবিক প্রসবকে একমাত্র সাফল্য হিসেবে তুলে ধরার পরিবর্তে, নিরাপদ প্রসবের সব পথকে—স্বাভাবিক, সহায়তাপ্রাপ্ত বা সিজার—সমানভাবে গ্রহণযোগ্য এবং সম্মানজনক বলে তুলে ধরা প্রয়োজন। একই সঙ্গে, যেসব মা প্রত্যাশার বাইরে কোনো প্রসব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, তাঁদের মানসিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাও জোরদার করা উচিত।

 

এই গবেষণাটি একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরলো। অনেক নারীই প্রসবকক্ষে নয়, প্রসবের আগেই সমাজের তৈরি অবাস্তব প্রত্যাশার শিকার হয়ে মানসিকভাবে আহত হন। মাতৃত্বের সাফল্য কোনো নির্দিষ্ট প্রসবপদ্ধতিতে নয়; বরং মা ও শিশুর সুস্থতা, নিরাপত্তা এবং ভালোবাসার বন্ধনেই নিহিত। সেই উপলব্ধিই হয়তো অসংখ্য মায়ের অপ্রয়োজনীয় অপরাধবোধ ও মানসিক যন্ত্রণা কমিয়ে আনতে পারে।

 

সূত্র: earth . com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × five =