বিশ্বের বহু দেশে কৃত্রিমভাবে বৃষ্টি আনার আশায় মেঘের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয় সিলভার আয়োডাইড (AgI)। এই পদ্ধতির নাম ক্লাউড সিডিং বা মেঘে বীজ রোপণ। কখনও খরার মোকাবিলা, কখনও জলাধার ভরাতে, আবার কখনও তুষারপাত বাড়াতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে : কেন সিলভার আয়োডাইড এত কার্যকর? এবার সেই দীর্ঘ রহস্যের জট খুলতে শুরু করেছেন অস্ট্রিয়ার টু উইন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা।
গবেষণার পরিচালক বিজ্ঞানী ইয়ান বালাইকা জানান, ১৯৪০-এর দশক থেকেই AgI ব্যবহৃত হচ্ছে, কারণ এর কেলাস গঠনের সাথে বরফের মিল রয়েছে। দুটোরই গঠন ষড়ভুজাকার, আর পরমাণুগুলোর মধ্যকার দূরত্বও প্রায় একই। ফলে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, মেঘে এই কণা ছড়িয়ে দিলে তা কেলাসিত করার কাজ করবে, আর সেই বরফই পরে বৃষ্টি বা তুষারে রূপ নেবে।
এই ধারণা প্রথম উত্থাপন করেন মার্কিন বিজ্ঞানী বার্নার্ড ভনেগাট ১৯৪৭ সালে। তবে নতুন গবেষণা জানাচ্ছে, বাস্তবতা আরও সূক্ষ্ম। বরফের জন্ম হয় কেলাসের ভেতরে নয়, বাইরের পৃষ্ঠে। আর সেখানেই লুকিয়ে ছিল আসল রহস্য।
গবেষকেরা অ্যাটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপি (AFM) ও উন্নত কম্পিউটার সিমুলেশনের সাহায্যে ২–৩ ন্যানোমিটার আকারের সিলভার আয়োডাইড ভেঙে তার পৃষ্ঠ বিশ্লেষণ করেন। দেখা যায়, ভাঙার পর এক পাশে থাকে রূপার পরমাণু, অন্য পাশে আয়োডিন পরমাণু।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হল রূপাযুক্ত পাশটি তার ষড়ভুজাকার বিন্যাস ধরে রাখে, যা বরফ গঠনের জন্য একেবারে আদর্শ ছাঁচের মতো কাজ করে। ফলে সেখানে সহজেই বরফের কেলাস জন্ম নেয়। কিন্তু আয়োডিনযুক্ত পাশটি বদলে গিয়ে আয়তাকার কাঠামোর রূপ নেয়, যা বরফের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই সেখানে বরফ তৈরি হয় না।
অর্থাৎ, সিলভার আয়োডাইডের প্রতিটি অংশ সমান কার্যকর নয়। রূপাযুক্ত পৃষ্ঠটিই হল আসল বৃষ্টিনির্মাতা। এভাবেই বহু বছরের বৈজ্ঞানিক বিতর্কের সমাধান হলো: কেলাসের ভেতরের গঠন নয়, তার পৃষ্ঠের পরমাণু বিন্যাসই হল আসল চাবিকাঠি।
এই গবেষণা সহজ ছিল না মোটেই। সিলভার আয়োডাইডের বিদ্যুৎ পরিবাহিতা কম হওয়ায় সাধারণ যন্ত্র কাজ করেনি। আবার আলোক-সংবেদী হওয়ায় এটি দৃশ্যমান আলোতে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই গবেষকদের প্রায় অন্ধকার কক্ষে, শুধু মৃদু লাল আলোয় পরীক্ষা চালাতে হয়েছে।
এখন বিজ্ঞানীরা জানতে চান, বাস্তব মেঘের ভেতরে যেখানে জল, বাতাস ও তাপমাত্রার জটিল পরিবেশ রয়েছে—সেখানেও কি সিলভার আয়োডাইড একইভাবে কাজ করে? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও নিখুঁত, কার্যকর ও পরিবেশ-সচেতন মেঘবীজ রোপণ বা ক্লাউড সিডিং প্রযুক্তির নতুন যুগ শুরু হতে পারে।
সূত্র: physics world. Com
