মৌমাছির গণিত জ্ঞান

মৌমাছির গণিত জ্ঞান

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১০ মে, ২০২৬

মৌমাছি কি সত্যিই গণিত বোঝে, নাকি তারা কেবল চোখে দেখা নকশারই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেয়? এই প্রশ্নটি বহুদিন ধরেই বৈজ্ঞানিক মহলে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। সম্প্রতি প্রসিডিংস অফ দ্য রয়্যাল সোসাইটি বি: বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস – এ বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত এক গবেষণা এই বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দিয়েছে। মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে— মৌমাছি শুধু এলোমেলোভাবে দৃশ্যমান নকশায় প্রতিক্রিয়া জানায় না; তারা সংখ্যাগত পার্থক্য উপলব্ধি করতে পারে। অর্থাৎ, এই ক্ষুদ্র পতঙ্গের মধ্যেও রয়েছে এক ধরনের মৌলিক গণিত-বোধ।

দীর্ঘদিন ধরে সমালোচকদের একটি বড় অংশ দাবি করে আসছিলেন যে মৌমাছিরা আসলে সংখ্যা বোঝে না, তারা কেবল চিত্রের ঘনত্ব, আকার বা বিন্যাসের মতো দৃশ্য সংকেতের উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এই নতুন গবেষণা সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে এক অভিনব উপায়ে মৌমাছির চোখে পৃথিবীকে দেখে। গবেষকরা পরীক্ষার নকশা এমনভাবে তৈরি করেন, যাতে তা মানুষের নয়, বরং মৌমাছির দৃষ্টিশক্তি ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। আর এখানেই বদলে যায় ফলাফল।

গবেষণার অন্যতম পরিচালক স্কারলেট হাওয়ার্ড জোর দিয়ে বলেন, প্রাণীর বুদ্ধিমত্তা বিচার করতে গেলে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেওয়া বড় ভুল। মানুষের চোখ ও মস্তিষ্ক যেভাবে তথ্য গ্রহণ করে, মৌমাছিরা তা থেকে একেবারেই ভিন্নভাবে উপলব্ধি করে। তাই তাদের বিচার করতে হলে তাদের জগতের নিয়মই আগে বুঝতে হবে।

অন্যদিকে, প্রধান গবেষক মির্কো জানন দেখিয়েছেন, যখন পরীক্ষার উপাদানগুলোকে মৌমাছির দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করা হয়, তখন আগের সব সমালোচনা কার্যত ভেঙে পড়ে। মৌমাছিরা কেবল প্যাটার্ন নয়, প্রকৃত সংখ্যাগত পার্থক্যও শনাক্ত করতে সক্ষম। এটাই এই গবেষণার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আবিষ্কার।

এই গবেষণা মৌমাছির ক্ষমতা নিয়ে নতুন বিস্ময় তৈরি করলো আমাদের মনে । সাথে এটাও শেখা গেল যে, প্রকৃতিকে বোঝার জন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। মানুষকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা ছেড়ে যখন আমরা অন্য প্রাণীর চোখে পৃথিবী দেখতে শিখি, তখনই তাদের আসল বুদ্ধিমত্তা ধরা পড়ে।

প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম প্রাণীও অবিশ্বাস্য জটিল ও বুদ্ধিমান হতে পারে। মৌমাছির এই গণিত-দক্ষতা একটি বিশেষ বার্তাবাহী। বুদ্ধিমত্তা শুধু আকারে বড়দের একচেটিয়া সম্পদ নয়, আসলে তা ছড়িয়ে আছে জীবনের প্রতিটি স্তরে।প্রকৃতির প্রতিটি জীবই তার নিজস্ব ধরণে অসাধারণ।

 

সূত্র: https://doi.org/10.1098/rspb.2025.3057

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 + twelve =