জিনগত জটিলতার জট ছাড়ানোর ক্ষেত্রে ডিএনএ বিশ্লেষণ আজ বিজ্ঞানের অন্যতম প্রয়োজনীয় হাতিয়ার। মানুষের রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে ব্যক্তি-নির্দিষ্ট চিকিৎসা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ব্যবহার উত্তরোত্তর বাড়ছে। ডিএনএ সিকোয়েন্সিংকে দ্রুত, নির্ভুল ও সাশ্রয়ী করে তোলার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালে রসায়নে উল্ফ পুরস্কার পেলেন পাস্কাল মায়ার, শঙ্কর বালসুব্রামানিয়ান এবং ডেভিড ক্লেনারম্যান।
আমরা জানি, ডিএনএ-র মধ্যে জীবের বংশগত বৈশিষ্ট্য ও জৈবিক কার্যকলাপের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশাবলি সংরক্ষিত থাকে। আর, ডিএনএ সিকোয়েন্সিং হলো এই অণুতে থাকা নিউক্লিওটাইডগুলির ক্রম নির্ধারণের পদ্ধতি। ডিএনএর এই ক্রম বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন রোগের জিনগত কারণ শনাক্ত করা, রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া এবং চিকিৎসার উপযুক্ত পদ্ধতি নির্ধারণ করা সম্ভব। কিন্তু একসময় একটি সম্পূর্ণ মানব জিনোমের অনুক্রম নির্ণয় করতে বিপুল অর্থ, সময় ও পরিশ্রমের প্রয়োজন হতো।
এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে এগিয়ে আসেন শঙ্কর বালসুব্রমানিয়ান ও ডেভিড ক্লেনারম্যান। তাঁরা এমন এক পদ্ধতির বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন, যার সাহায্যে এক চোটে বিপুল সংখ্যক ডিএনএ খণ্ডের অনুক্রম নির্ণয় করা যায়। এই প্রযুক্তির নাম ‘ম্যাসিভলি প্যারালাল সিকোয়েন্সিং’। একটির পর একটি ডিএনএ বিশ্লেষণ করার পরিবর্তে অসংখ্য ডিএনএ খণ্ডকে সমান্তরালভাবে বিশ্লেষণ করার ফলে সিকোয়েন্সিংয়ের গতি বহুগুণ বাড়ে, স্বাভাবিকভাবে খরচও কমে। এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ডিএনএ বিশ্লেষণের গতি ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রায় দশ লক্ষ গুণ উন্নতি ঘটাতে সাহায্য করেছে। ফলে একটি সম্পূর্ণ মানব জিনোমের অনুক্রম নির্ণয়ের খরচ ২০০ ডলারেরও নীচে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
অন্যদিকে, পাস্কাল মায়ার এই বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকে ব্যবহারিক ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সিকোয়েন্সিং ব্যবস্থায় রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। রসায়ন, মাইক্রোফ্লুইডিক্স, আলোকবিজ্ঞান এবং কম্পিউটেশনাল প্রযুক্তিকে একত্রিত করে তিনি এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করেন, যা দ্রুত ও বিপুল পরিমাণ জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে।
এই তিন বিজ্ঞানীর সম্মিলিত কাজ ডিএনএ সিকোয়েন্সিংকে গবেষণাগারের গণ্ডি টপকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের কার্যকর প্রযুক্তিতে পরিণত করেছে। জিনগত রোগ শনাক্তকরণ, ক্যানসার গবেষণা, সংক্রামক রোগের নজরদারি এবং ব্যক্তি-নির্দিষ্ট চিকিৎসার বিকাশে এই প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই তিন বিজ্ঞানীর অবদান আধুনিক জিনোমিক চিকিৎসার অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করেছে, ভবিষ্যতে আরও সহজলভ্য ও উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থার পথ প্রশস্ত করেছে।
সূত্র: universitedestrasbourg University of Cambridge
