রাত-কে দিন বানানো উপগ্রহ 

রাত-কে দিন বানানো উপগ্রহ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৮ জুলাই, ২০২৬

ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক সংস্থা রিফ্লেক্ট অরবিটাল মহাকাশে Eärendil-1 নামে একটি পরীক্ষামূলক উপগ্রহ পাঠাতে চায়। এই উপগ্রহে থাকবে প্রায় ১৮ মিটার চওড়া এক প্রতিফলক আয়না, যা সূর্যের আলোকে প্রতিফলিত করে পৃথিবীর নির্দিষ্ট অঞ্চলে পাঠাবে। সংস্থার দাবি, এতে প্রায় ৫ কিলোমিটার প্রশস্ত একটি এলাকা কয়েক মিনিটের জন্য পূর্ণিমার রাতের মতো আলোকিত হবে। তবে আপাতত অনুমতি পাওয়া গেছে মাত্র একটি পরীক্ষামূলক উপগ্রহ উৎক্ষেপণের-ই। ভবিষ্যতে হাজার হাজার এমন উপগ্রহ পাঠানোর জন্য নতুন করে অনুমোদন নিতে হবে। রিফ্লেক্ট অরবিটাল -এর লক্ষ্য অনেক বড়। সংস্থাটি ২০৩৫ সালের মধ্যে ৫০ হাজারেরও বেশি প্রতিফলক উপগ্রহ মহাকাশে স্থাপন করতে চায়। তাদের ভাষায়, এটি হবে চাহিদামতো সূর্যালোক সরবরাহের ব্যবস্থা। এই প্রযুক্তির নানা ব্যবহার হতে পারে। সূর্যাস্তের পরও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় বাড়ানো সম্ভব হবে। রাতের বেলায় নির্মাণকাজে অতিরিক্ত আলো পাওয়া যাবে। দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকাজেও এটি সহায়ক হতে পারে। এছাড়া ডিজেলচালিত জেনারেটর বা স্থায়ী আলোকব্যবস্থা ছাড়াই অস্থায়ীভাবে আলো দেওয়া সম্ভব হবে বলে তাদের দাবি। রিফ্লেক্ট অরবিটাল-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী বেন নোওয়াক বলেন, এই অনুমোদন তাদের প্রযুক্তির কার্যকারিতা এবং নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রথম ধাপ। Eärendil-1 পৃথিবী থেকে প্রায় ৬২৫ কিলোমিটার উচ্চতায় নিম্ন কক্ষপথে ঘুরবে। উপগ্রহটি দ্রুত গতিতে চলার সময় আয়নার অবস্থান পরিবর্তন করে নির্দিষ্ট এলাকায় সূর্যের আলো ফেলবে। তবে একটি স্থানে আলো থাকবে মাত্র কয়েক মিনিট। পরে উপগ্রহটি অন্যদিকে চলে যাবে। যদিও এই পরিকল্পনা প্রযুক্তিগত দিক থেকে আকর্ষণীয়, তবু এটি নিয়ে উদ্বেগও কম নয়। বিশেষ করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এই ধরনের উপগ্রহ রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বর্তমানে অনেক উপগ্রহ সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে টেলিস্কোপের ছবিতে আলোর রেখা তৈরি করে। কিন্তু Eärendil-1-এর মূল উদ্দেশ্যই হলো পৃথিবীর দিকে আলো পাঠানো। ফলে বড় টেলিস্কোপে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে। আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি এই প্রকল্পের অনুমতি না দেওয়ার আবেদন জানায়। তাদের আশঙ্কা, প্রতিফলিত তীব্র আলো সংবেদনশীল বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির ক্ষতি করতে পারে। পাশাপাশি বিমানচালক, গাড়িচালক কিংবা টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশ দেখার সময় মানুষের চোখেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। প্রকল্পটি ঘিরে এখন আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিষয়টি শুধু মহাকাশে একটি আয়না পাঠানোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতার নয়। বরং প্রশ্ন হলো, রাতের অন্ধকার, পৃথিবীর আকাশ এবং নিম্ন কক্ষপথের ব্যবহার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কার? যদি ভবিষ্যতে বেসরকারি সংস্থাগুলি ইচ্ছামতো রাতের আকাশ আলোকিত করতে পারে, তাহলে তার পরিবেশগত, বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক প্রভাব কে মূল্যায়ন করবে? রিফ্লেক্ট অরবিটালের পরিকল্পনা নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগও বাড়ছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, হাজার হাজার প্রতিফলক উপগ্রহ মহাকাশে গেলে টেলিস্কোপে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ ব্যাহত হতে পারে। এতে শুধু গবেষণাই নয়, প্রকৃতির স্বাভাবিক দিন-রাতের ছন্দও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষের জৈবিক ঘড়ি অন্ধকারের উপর নির্ভরশীল। কৃত্রিম আলো আশপাশের জনবসতি, বনাঞ্চল বা সড়কেও প্রভাব ফেলতে পারে। আয়নার দিক পরিবর্তনের সময় সৃষ্ট আলোর ঝলক বিমানচালক বা গাড়িচালকদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সংস্থার অবশ্য দাবি, উপগ্রহের আলোর তীব্রতা, অবস্থান ও সময় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। বাস্তবে তা কতটা সম্ভব, সেটিই পরীক্ষা করবে Eärendil-1। যদিও আলো দূষণ বা পরিবেশগত প্রভাব তাদের মূল্যায়নের আওতায় নয়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—মহাকাশে বাণিজ্যিক প্রকল্পের পরিবেশগত ও বৈজ্ঞানিক প্রভাব মূল্যায়নের দায়িত্ব আসলে কার?

গবেষকদের মতে, এই পরীক্ষা ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেবে। তবে একই সঙ্গে এটি এমন এক নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে প্রাকৃতিক রাতের অন্ধকারও একদিন বাণিজ্যিক পরিষেবায় পরিণত হতে পারে।

 

 

সূত্র : https://physicsworld.com/a/astronomers-express-outrage-after-regulators-approve-space-mirror-permit/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × one =