লিভারের চিকিৎসায় সহায়ক নতুন মডেল  

লিভারের চিকিৎসায় সহায়ক নতুন মডেল  

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৫ জুলাই, ২০২৬

মানবদেহের কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গই বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে না। তারা একটি জটিল জৈবিক নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে একে অপরের সঙ্গে অবিরাম যোগাযোগ বজায় রাখে। তাই কোনো একটি অঙ্গকে আলাদা করে বিশ্লেষণ করলে রোগের প্রকৃত চিত্র সবসময় স্পষ্ট হয় না। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে বিজ্ঞানীরা এই প্রথম লিভার, অগ্ন্যাশয় এবং পিত্তনালির অর্গানয়েডকে একত্র করে পরীক্ষাগারে একটি জীবন্ত মডেল তৈরি করেছেন। এই মডেলটি মানবদেহের স্বাভাবিক বিকাশ ও রোগপ্রক্রিয়াকে আগের যেকোনো অর্গানয়েড মডেলের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুলভাবে অনুকরণ করতে সক্ষম। গবেষণাটির সম্পূর্ণ বিবরণ বিস্তারিতভাবে নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন এনওয়াইএসসিএফ- রবার্টসন স্টেম সেল ইনভেস্টিগেটর, সিনসিনাটি চিলড্রেনস হাস্পাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ তথা সহকারী অধ্যাপক এবং ইয়োকোহামা সিটি ইউনিভার্সিটির রিজেনারেটিভ মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক ড. তাকানোরি তাকেবে এবং তাঁর সহকর্মীরা। তাঁদের উদ্ভাবিত নতুন ব্যবস্থা একই সঙ্গে লিভার, অগ্ন্যাশয় ও পিত্তনালির অর্গানয়েড নিয়ে গঠিত। ফলে এই তিনটি অঙ্গ কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে, একে অপরের বিকাশে ভূমিকা রাখে এবং রোগের সময় কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, তা অনেক বেশি বাস্তবসম্মতভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে।

কী এই অর্গানয়েড? অর্গানয়েড হলো গবেষণাগারে স্টেম সেল থেকে তৈরি কৃত্রিম ও ক্ষুদ্র ত্রিমাত্রিক কোষসমষ্টি, যা মানুষের আসল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গঠন ও কার্য অবিকল অনুকরণ করতে পারে। এতদিন অধিকাংশ গবেষণায় একটি মাত্র অঙ্গের অর্গানয়েড ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে অনেক রোগ একাধিক অঙ্গকে একসঙ্গে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে লিভারের বিভিন্ন রোগের ক্ষেত্রে লিভার আক্রান্ত হলে তার প্রতিবেশী অগ্ন্যাশয় এবং পিত্তনালি ছাড় পায় না। একজন ফাঁসলে বাকিদেরও ফাঁসানোর সেই একটা পারস্পরিক সম্পর্ক থেকেই যাচ্ছিল।

গবেষকরা প্রথমে মানব স্টেম সেল ব্যবহার করে ক্ষুদ্র গোলাকার টিস্যু বা স্ফেরয়েড তৈরি করেন, যেগুলো ভ্রূণের প্রাথমিক পরিপাকতন্ত্রের (ফোরগাট ও মিডগাট) কোষের বৈশিষ্ট্য বহন করে। এরপর এই স্ফেরয়েডগুলোকে একটি বিশেষ জেল-সমৃদ্ধ পরিবেশে পাশাপাশি স্থাপন করা হয়। সেখানে কোনো অতিরিক্ত রাসায়নিক উপাদান বা জোরপূর্বক নির্দেশনা ছাড়াই বিভিন্ন স্ফেরয়েডের কোষ একে অপরের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে যোগাযোগ স্থাপন করতে শুরু করে। এই আন্তঃক্রিয়ার ফলে ধীরে ধীরে কোষগুলো আরও পরিণত হয়ে লিভার, অগ্ন্যাশয় এবং পিত্তনালির বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন অর্গানয়েডে রূপান্তরিত হয়।

প্রায় ৭০ দিন ধরে বিকশিত হওয়ার পর গবেষকরা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করেন। এই বহু-অর্গানয়েড ব্যবস্থা শুধু বিভিন্ন অঙ্গের কোষই তৈরি করেনি, উপরন্তু পিত্ত অ্যাসিড তৈরির প্রক্রিয়াকরণও শুরু করেছে, যা স্বাভাবিক হজমক্রিয়ার একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। গবেষকরা এতটা সাফল্য আশা করেন নি। তাঁরা ধারণা করেছিলেন, এই ধরনের কার্যকারিতা অর্জনের জন্য হয়তো অতিরিক্ত জৈব রাসায়নিক সংকেত প্রয়োজন হবে। কিন্তু কোষগুলোকে তাদের স্বাভাবিক বিকাশের সুযোগ দেওয়াতেই এই জটিল প্রক্রিয়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

এই গবেষণাটির গুরুত্ব বহুমাত্রিক। প্রথমত, এটি লিভারের রোগ কীভাবে শুরু হয় এবং কীভাবে ধাপে ধাপে জটিল রূপ ধারণ করে, সে সম্পর্কে আরও নির্ভুল ধারণা দেবে। দ্বিতীয়ত, রোগীর নিজস্ব স্টেম সেল থেকে অর্গানয়েড তৈরি করা সম্ভব হওয়ায় তার জিনগত বৈশিষ্ট্যও এই মডেলে প্রতিফলিত হবে। ফলে চিকিৎসকেরা রোগীর শরীরে প্রয়োগের আগেই বিভিন্ন ওষুধের কার্যকারিতা ও সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পরীক্ষাগারেই যাচাই করে নিতে পারবেন। ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা বা পার্সোনালাইজড মেডিসিন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এককথায় এটি একটি নতুন পথের দিশারী।

এই অপ্রত্যাশিত সাফল্যের পরে এখন, গবেষকরা ভবিষ্যতের বহুবিধ পরিকল্পনা করছেন। আপাতত, এই ত্রি -অর্গানয়েড ব্যবস্থার সঙ্গে রোগপ্রতিরোধী কোষ এবং রক্তনালির পূর্বসূরি কোষ যুক্ত করাই তাদের পররবর্তী পরিকল্পনা। এর থেকেই দীর্ঘমেয়াদে লক্ষ্য থাকবে স্টেম সেল থেকে কার্যকর ও প্রতিস্থাপনযোগ্য একটা গোটা মানব লিভার তৈরি করা। সেইসব লক্ষ্য অর্জনে এখনও বহু বহু বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত বাধা অতিক্রম করতে হবে। তবুও এই নতুন প্রযুক্তি লিভারের রোগ নির্ণয়, ওষুধ উন্নয়ন, রোগের প্রাথমিক পর্যায়ের পরিবর্তন শনাক্তকরণ এবং পুনর্জনন চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী অগ্রগতি হিসেবেই বিবেচ্য। বিজ্ঞানীদের আশা, ভবিষ্যতে এই বহু-অর্গানয়েড ব্যবস্থা লিভারের যেকোনো রোগে আক্রান্ত অগণিত মানুষের জন্য দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর চিকিৎসা উদ্ভাবনের পথও সুগম করবে।

 

সূত্র: Modelling human hepato-biliary-pancreatic organogenesis from the foregut–midgut boundary by Hiroyuki Koike, TakanoriTakebe, et.al;published in Nature. 2019. https://www.nature.com/articles/s41586-019-1598-0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 − 2 =