শতবর্ষে পা রাখলেন ডেভিড অ্যাটেনবরো

শতবর্ষে পা রাখলেন ডেভিড অ্যাটেনবরো

সুপর্ণা চট্টোপাধ্যায়
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ২৩ মে, ২০২৬

রুয়ান্ডার পাহাড়ি জঙ্গল। একটি মানুষ মাটিতে বসে। আচমকাই দুটি ছোট গরিলা দৌড়ে এসে তাঁর সঙ্গে খেলতে শুরু করল। কেউ তাঁর জামা ধরে টানছে, কেউ কৌতূহলী চোখে মুখের দিকে তাকাচ্ছে। একটু দূরে বসে সতর্ক নজরে সবটা দেখছে তাদের মা। কোনও আতঙ্ক নেই, নেই হিংস্রতার চিহ্ন। বরং আছে বিশ্বাস, কৌতূহল আর প্রকৃতির এক কোমল মুখ। মানুষটি ডেভিড অ্যাটেনবরো। আর ১৯৭৮ সালের ওই দৃশ্যটাই বদলে দিয়েছিল কোটি কোটি মানুষের চোখে গরিলার রূপ। কারণ, তার আগে লোকের ধারণা ছিল, গরিলা মানেই এক হিংস্র দানব- হলিউডের পর্দায় বুক চাপড়ানো আতঙ্ক। অ্যাটেনবরো সেই ছবিটাই উল্টে দিলেন। তিনি দেখালেন, গরিলারাও শান্ত, লাজুক, গভীরভাবে সামাজিক। মানুষ আর বন্যপ্রাণীর মাঝখানে যে দূরত্ব আমরা তৈরি করেছি, তিনি যেন এক মুহূর্তে তা সরিয়ে দিয়েছিলেন।এই হল তাঁর উপস্থাপনা। প্রকৃতির মধ্যে অবাধে মিশে যাবার সাবলীল ক্ষমতা।

 

আজ শতবর্ষের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ডেভিড অ্যাটেনবরো। পিছনে তাকালে, তাঁর জীবনটাও কিছু কম বিস্ময়কর নয়। ১৯২৬ সালের ৮ মে ইংল্যান্ডে জন্ম ডেভিডের। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর বড় ভাই রিচার্ড অ্যাটেনবরো ছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা ও পরিচালক। ছোটবেলা থেকেই ডেভিডের আগ্রহ ছিল জীবাশ্ম নিয়ে। কোটি কোটি বছর আগের কোনও প্রাণীর জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়া তাঁর কাছে ছিল যেন “জাদুর মতো”। ২০১৯ সালে জার্মান পত্রিকা ডের স্পিগেল-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এমনটাই বলেছিলেন। তাঁর ভাবতে অবাক লাগত, যে প্রাণী ১৫ কোটি বছর সূর্যের আলো দেখেনি, তার চিহ্ন তিনি নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন। শুধু সেই নেশাতেই ছোট ডেভিড সাইকেল চালিয়ে দূরের খনিতে চলে যেতেন জীবাশ্ম খুঁজতে। ১৯৩৬ সালে ‘ধূসর পেঁচা’ নামে পরিচিত ব্রিটিশ লেখক ও পরিবেশরক্ষক আর্চিবল্ড বেলানির এক বক্তৃতা ডেভিডকে খুব প্রভাবিত করে। সেই বক্তৃতাই প্রকৃতির প্রতি তাঁর আকর্ষণ বাড়িয়ে তোলে। ১৯৪৭ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ন্যাচারাল সায়েন্সেসে ডিগ্রি নেওয়ার পর দু’বছর তিনি ব্রিটিশ নৌবাহিনীতে কাজ করেন। এরপর ১৯৫০ সালে তিনি বিবিসি-র রেডিও বিভাগে চাকরির জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তাঁকে পাঠানো হয় নতুন টেলিভিশন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে। মজার বিষয়, শুরুতে কেউই ভাবেননি এই ডেভিড-ই বড় টিভি তারকা হবেন। পরে এক সাক্ষাৎকারে অ্যাটেনবরো হাসতে হাসতেই বলেছিলেন, বিবিসি-র কর্তারা নাকি মন্তব্য করেছিলেন, “ছেলেটি হয়তো ভালো প্রযোজক হতে পারে, কিন্তু ক্যামেরার সামনে নয়। ওর দাঁত খুব বড়!” একদিন এক উপস্থাপক অসুস্থ হয়ে পড়ায় হঠাৎই ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হয় তাঁকে। ১৯৫৩ সালে অ্যানিম্যাল ডিসগাইজেস-এ প্রথম টেলিভিশনে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। এরপর শুরু হয় এক কিংবদন্তির যাত্রা। ধীরে ধীরে বিবিসি-র গুরুত্বপূর্ণ পদে উঠে আসেন তিনি এবং পরে বিবিসি ২-এর প্রধান হন। ইউরোপে রঙিন টেলিভিশন সম্প্রচার জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রেও তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। এমনকি ১৯৬৯ সালে বিখ্যাত কমেডি সিরিজ সম্প্রচারের অনুমোদনও দিয়েছিলেন এই ডেভিড। তবু অফিসঘরের উচ্চপদ তাঁর মন টানতে পারেনি। তিনি ফিরে গিয়েছিলেন নিজের আসল ভালোবাসার কাছে- প্রকৃতির গল্প বলা। গত সাত দশকে তিনি শুধু তথ্যচিত্র নির্মাতাই হয়ে থাকেননি , বরং হয়ে উঠেছেন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রকৃতির গল্পকার। তাঁর কণ্ঠেই সুপরিচিত হয়েছে গভীর সমুদ্রের অন্ধকার জগৎ, বরফঢাকা অ্যান্টার্কটিকার জীবন, জঙ্গল কিংবা মরুভূমিতে বহু অজানা প্রাণীর টিকে থাকার নিঃশব্দ লড়াই। ডেভিড অ্যাটেনবরোর নরম, আধা-ফিসফিসে কণ্ঠ ধীরে ধীরে যেন প্রকৃতির নিজস্ব ভাষা হয়ে ওঠে।

 

শুরুর সময়ে টেলিভিশনে বিজ্ঞান মানেই ছিল গম্ভীর বক্তৃতা মাত্র। একজন বিশেষজ্ঞ ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তথ্য বলতেন, আর ছবিগুলি থাকত শুধুই সহায়ক উপাদান হিসেবে। অ্যাটেনবরো সেই ধারা ভাঙলেন। ব্রিটিশ এই সম্প্রচারক, প্রকৃতিবিদ ও লেখক ইতিমধ্যেই গড়েছেন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড। দীর্ঘ সময়ের টেলিভিশন উপস্থাপক ও প্রকৃতিবিদ হিসেবে কাজ করার জন্য। তাঁর বিশেষত্ব ছিল, তিনি প্রকৃতিকে নাটকীয় করে তুলতেন না, প্রকৃতির নিজস্ব নাটককেই সামনে আনতেন। তাঁর নরম, ফিসফিসে কণ্ঠ দর্শকদের মনে এক ধরনের ঘনিষ্ঠতা তৈরি করত। মনে হত, প্রকৃতি যেন দূরের কোনও বিষয় নয়, বরং আমাদের খুব কাছের। দ্য ব্লু প্ল্যানেট’, ‘প্ল্যানেট আর্থ’ কিংবা ‘লাইফ অন আর্থ’—তাঁর প্রতিটি ধারাবাহিকই দর্শকদের পৃথিবীর অজানা কোণে পৌঁছে দিয়েছে। ১৯৭৯ সালের ‘লাইফ অন আর্থ’ টেলিভিশনের ইতিহাস বদলে দিয়েছিল। ১৩ পর্বের এই সিরিজ তৈরিতে তিন বছর সময় লেগেছিল। অ্যাটেনবরো ও তাঁর দল ৪৯টি দেশে ঘুরে ৬৫০ প্রজাতির প্রাণীকে ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন। তখনকার প্রযুক্তি ও বাজেটে এ ছিল প্রায় অসম্ভব এক উদ্যোগ। কিন্তু সেই ঝুঁকিই ইতিহাস তৈরি করে। বিশ্বের প্রায় ৫০ কোটি মানুষ দেখেছিল অনুষ্ঠানটি। তখনকার বিশ্ব জনসংখ্যার এক বিরাট অংশ। এই সিরিজের বহু দৃশ্য মানুষ আগে কখনও দেখেনি। যেমন চিলি ও আর্জেন্টিনার ছোট্ট “ডারউইনস ফ্রগ”-এর অদ্ভুত জীবনচক্র। পুরুষ ব্যাঙ ডিম মুখে নিয়ে তা ফোটায়, পরে মুখ থেকেই বেরিয়ে আসে ছোট ব্যাঙ। শুটিং চলাকালীন ‘পাবলো’ নামের তিন বছরের একটি পাহাড়ি গরিলা এসে অ্যাটেনবরোর গায়ে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ে। দৃশ্যটি ছিল পুরোপুরি স্বতঃস্ফূর্ত। তখনই তিনি বলে ফেলেছিলেন, “গরিলার সঙ্গে চোখে চোখ রেখে যে বোঝাপড়া হয়, অন্য কোনও প্রাণীর সঙ্গে তা হয় না।” শুধু দর্শকরাই নয়, প্রাণীরাও যেন তাঁকে নিজেদের একজন বলে ভাবে।

 

ডেভিড অর্জন করেছেন অসংখ্য সম্মান। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে দিয়েছে ৩২টি সম্মানসূচক ডিগ্রি। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে দুটি নাইটহুডও। প্রকৃতি বিষয়ক তথ্যচিত্র নির্মাণ এবং পরিবেশ রক্ষায় তাঁর দীর্ঘদিনের ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মান। তবে শুধু পুরস্কারেই নয়, ডিজিটাল যুগেও তাঁর জনপ্রিয়তা অবাক করার মতো। ২০২০ সালে তিনি ইনস্টাগ্রামে অ্যাকাউন্ট খোলা মাত্র ৪ ঘণ্টা ৪৪ মিনিটের মধ্যেই ১০ লক্ষ অনুসারী পেয়ে গিনেস রেকর্ড গড়েছিলেন। শতবর্ষের কাছাকাছি পৌঁছেও তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁর আকর্ষণ এতটাই প্রবল। ২০১৭ সালে বিবিসি তে, ব্লু প্ল্যানেট-২ সম্প্রচার শুরু হলে চীনে দর্শকদের উন্মাদনা এতটাই বেড়ে যায় যে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে সাময়িক ইন্টারনেট ধীরগতির খবরও প্রকাশিত হয়। টেলিভিশনের ইতিহাসেও তিনি এক বিরল নজির। সাদা-কালো যুগ থেকে রঙিন সম্প্রচার, তারপর HD, 3D এবং 4K—টেলিভিশনের প্রতিটি বড় প্রযুক্তিগত যুগেই ব্রিটেনের মর্যাদাপূর্ণ বাফতা পুরস্কার জিতেছেন তিনি। এমন কৃতিত্ব আর কারও নেই। ব্রিটেনে তাঁকে অনেকেই “ন্যাশনাল ট্রেজার” বা জাতীয় সম্পদ বলে ডাকেন। যদিও এই উপাধি নিয়ে তিনি নিজে বরাবরই কিছুটা অস্বস্তিতে ছিলেন।

 

প্রকৃতির প্রতি তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ৪০টিরও বেশি প্রাণী ও উদ্ভিদের নাম রাখা হয়েছে তাঁর নামে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাগৈতিহাসিক সামুদ্রিক সরীসৃপ অ্যাটেনবরোসরাস এবং মাদাগাস্কারের ফড়িং অ্যাটেনবরোর পিনটেল। তবে এত প্রাণীর বন্ধু হলেও একটি প্রাণীকে তিনি ভীষণ ভয় পান, ইঁদুরকে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “মারণ মাকড়সা, সাপ বা বিচ্ছুকে আমি ভয় পাই না। কিন্তু ইঁদুর দেখলেই আমি সবার আগে দৌড়ব।” বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর তথ্যচিত্রের সুরও বদলেছে। জীবনের প্রথমদিকে তিনি মূলত প্রকৃতির সৌন্দর্য তুলে ধরতেন। কিন্তু পরে তিনি বুঝতে পারেন, শুধু সৌন্দর্য দেখানো যথেষ্ট নয়, মানুষকে সতর্ক করাও জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, দূষণ ও জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস নিয়ে তিনি ক্রমশ আরও সরব হয়ে ওঠেন। তাঁর সাম্প্রতিক তথ্যচিত্র ‘ওশান উইথ ডেভিড অ্যাটেনবরো’-এ সমুদ্রতলের ধ্বংসের যে ছবি উঠে এসেছে, তা অনেক দর্শককে নাড়িয়ে দিয়েছে। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, শিল্পোন্নয়ন ও অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে কীভাবে সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে তিনি বহু আন্তর্জাতিক মঞ্চে কথা বলেছেন। তবে তাঁর বক্তব্যে আতঙ্ক নয়, বরং আশা বেশি থাকে। প্ল্যানেট আর্থ-এ তিনি বলেছিলেন, “পৃথিবীকে ধ্বংস করব নাকি আগলে রাখব, সেই সিদ্ধান্ত আমাদেরই।” ২০২২ সালে তিনি পান ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে তিনি পান রাষ্ট্রসংঘের সর্বোচ্চ পরিবেশ সম্মান- ইউএন চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড। প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় তাঁর আজীবনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই পুরস্কার দেওয়া হয়। একই বছর শান্তিতে পোপ ফ্রান্সিস এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-এর সঙ্গে নোবেল শান্তি পুরস্কারের মনোনয়নেও উঠে আসে তাঁর নাম। লেখক সাইমন বার্নস তখন লিখেছিলেন, “যদি পৃথিবীকে সত্যিই বাঁচানো যায়, তবে তার পিছনে অ্যাটেনবরোর অবদান হবে সবার চেয়ে বেশি ।”

মৃত্যু নিয়েও তাঁর ভাবনা আশ্চর্য রকম প্রশান্ত। ২০২০ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না। শুধু চাই, ব্যাপারটা যেন খুব দ্রুত হয়।” বয়স শত ছুঁলেও প্রকৃতির প্রতি তাঁর ভালোবাসা বা সেই বিস্ময় মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার উৎসাহ এতটুকুও কমেনি। হাঁটার গতি হয়তো আগের মতো নেই, কিন্তু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেই এখনও তাঁর চোখে ধরা পড়ে সেই পুরনো কৌতূহল। তাই অ্যাটেনবরোর উত্তরাধিকার শুধু কিছু অসাধারণ তথ্যচিত্র নয়, তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হল, পৃথিবীকে কেবল সম্পদ হিসেবে না দেখে এক জীবন্ত, স্পন্দিত সহযাত্রী হিসেবে দেখতে শেখানোয়।

 

সূত্র: Nature, Frontline; BBC ; May 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two + eighteen =