শব্দে জব্দ ভাইরাস 

শব্দে জব্দ ভাইরাস 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২০ মে, ২০২৬

সম্প্রতি ব্রাজিলের বিজ্ঞানীরা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে একটি নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে ভবিষ্যতে ওষুধ বা রাসায়নিক ছাড়াই নাকি ভাইরাস মোকাবিলা করা যেতে পারে। সেই মতো প্রমাণস্বরূপ সাম্প্রতিক এক গবেষণায় তাঁরা দেখিয়েছেন, উচ্চ-কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ বা আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহার করে পরীক্ষাগারে COVID-19 এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসকে কার্যকরভাবে নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হয়েছে। এই গবেষণাটি নিঃসন্দেহে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ভাইরোলজির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবেই বিবেচ্য।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ব্রাজিলের সাও পাওলোর গবেষকেরা। তাঁরা ৩ থেকে ২০ মেগাহার্টজ কম্পাঙ্কের আল্ট্রাসাউন্ড তরঙ্গ SARS-CoV-2 এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা A (H1N1) ভাইরাসের ওপর প্রয়োগ করেন। গবেষণায় দেখা যায়, এই উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ ভাইরাসের ভেতরে ক্ষুদ্র কম্পন সৃষ্টি করে, যা ধীরে ধীরে এত শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে ভাইরাসের বাইরের আবরণ বা ঝিল্লি ফেটে যায়। ফলে ভাইরাস তার সংক্রমণ ক্ষমতা হারায়।

গবেষক ওডেমির মার্টিনেজ ব্রুনোর মতে এই প্রক্রিয়াটি অনেকটা শব্দ দিয়ে ভাইরাসকে জব্দের মতো। তাঁর মতে, শব্দতরঙ্গের শক্তি ভাইরাসের গোলাকার গঠনের ভেতরে জমতে থাকে এবং একসময় তা পপকর্নের মতো খোলস ফাটিয়ে বেরিয়ে পড়ে। এই ঘটনা ঘটে মূলত শাব্দিক অনুরণনের কারণে। অর্থাৎ, যখন শব্দতরঙ্গের কম্পাঙ্ক ভাইরাসের স্বাভাবিক কম্পনের সঙ্গে মিলে যায়, তখন ভাইরাসের গঠন অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। পরীক্ষাগারে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, আল্ট্রাসাউন্ডে আক্রান্ত ভাইরাসগুলোর সংক্রমণ ক্ষমতা কমে গেছে। গবেষকেরা নিশ্চিত করেছেন যে এই প্রভাব তাপ বা রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে নয়; শব্দতরঙ্গের কারণেই সৃষ্ট যান্ত্রিক কম্পনের ফল।

এই প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক কার্যকারিতা। এই পদ্ধতি প্রচলিত নিম্ন কম্পাঙ্কের আল্ট্রাসাউন্ড জীবাণুনাশক প্রযুক্তি থেকে আলাদা। সাধারণ আল্ট্রাসাউন্ডে ক্যাভিটেশন নামের একটি প্রক্রিয়ায় তরল মাধ্যমের মধ্যে বুদবুদ তৈরি ও বিস্ফোরণের মাধ্যমে জীবাণু ধ্বংস হয়, যা আশপাশের কোষকলাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কিন্তু নতুন এই প্রযুক্তি তুলনামূলকভাবে নির্দিষ্ট ভাইরাসকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে এবং পরীক্ষায় দেখা গেছে, আশপাশের কোষের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব কম।

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি একটি পরিবেশবান্ধব অ্যান্টিভাইরাল পদ্ধতিতে পরিণত হতে পারে। কারণ এতে কোনো রাসায়নিক বর্জ্য তৈরি হয় না এবং ভাইরাসের জিনগত পরিবর্তন বা পরিব্যক্তি হলেও প্রযুক্তিটি কার্যকর থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে গবেষণাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এটি কেবল পরীক্ষাগারে পরিচালিত হয়েছে; এখনো কোনো প্রাণী বা মানুষের ওপর এর পরীক্ষা হয়নি। গবেষকেরা বর্তমানে পরীক্ষা করছেন, একই প্রযুক্তি ডেঙ্গু, জিকা ও চিকুনগুনিয়ার মতো অন্যান্য ভাইরাসের বিরুদ্ধেও কাজ করে কি না। যদি ভবিষ্যতে এই গবেষণা সফলভাবে বাস্তব প্রয়োগ করা যায়, তাহলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি ভাইরাস মোকাবিলার অন্যতম জোরালো অস্ত্র হতে চলেছে তো বটেই।

 

সূত্র: ScienceAlert

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

7 + fourteen =