আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (IUCN)-এর লাল তালিকা বলছে, গভীর সমুদ্র নিবাসী শামুক, ঝিনুক, মাশেল, চিটন, অক্টোপাস ও স্কুইড প্রভৃতি মোলাস্ক গোষ্ঠীর বহু প্রজাতি এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। মূল কারণ গভীর সমুদ্রে খনিজ অনুসন্ধান ও উত্তোলন। আইইউসিএনের নতুন লাল তালিকায় মোট ১,৭৫,৯০৯টি প্রজাতির মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯,৫০৫টি প্রজাতি বর্তমানে বিলুপ্তির হুমকির মুখে। মোলাস্ক পৃথিবীর সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের অন্যতম বড় অংশ। সব জীবিত সামুদ্রিক প্রজাতির প্রায় এক-চতুর্থাংশই এই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। খাদ্য, পরিবেশের ভারসাম্য এবং কৃষ্টির দিক থেকেও এদের গুরুত্ব অনেক। গভীর সমুদ্রের হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট বা সমুদ্রতলের উষ্ণ প্রস্রবণের আশপাশে থাকা ২০১টি স্থানীয় মোলাস্ক প্রজাতির ১২৫টি-ই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রাণীগুলি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫ হাজার মিটার গভীরে বাস করে, যেখানে ৪৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি তাপমাত্রার জল নির্গত হয়। বিরল পরিবেশে থাকা বহু শামুক, ঝিনুক, মাশেল ও চিটন প্রজাতি গত এক দশকের মধ্যেই আবিষ্কৃত হয়েছে। কিন্তু আবিষ্কারের অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের অস্তিত্ব বিপদের মুখে পড়েছে। ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত মূল্যবান খনিজের চাহিদা বাড়ায় সমুদ্রতলে খননের আগ্রহও বাড়ছে। খননের সময় সৃষ্ট পলি বা সেডিমেন্ট প্লুম জলে ছড়িয়ে পড়ে প্রাণীদের শরীর ঢেকে দেয়। এতে তাদের শ্বাস নেওয়া ও পুষ্টি গ্রহণ ব্যাহত হয়। এরই মধ্যে লিরাপেক্স ফেলিক্স নামে একটি বিরল সামুদ্রিক শামুককে আইইউসিএনের লাল তালিকায় ‘চরম বিপন্ন’ গোত্রে ফেলা হয়েছে। ভারত মহাসাগরে চলমান খনিজ অনুসন্ধানের কারণে এই প্রজাতি দ্রুত বিলুপ্তির মুখে এগোচ্ছে। আইইউসিএনের বিশেষজ্ঞ জুলিয়া সিগওয়ার্ট বলেন, গভীর সমুদ্রের এই মোলাস্কগুলো বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রাণীগোষ্ঠীগুলোর একটি। তাই সব ধরনের ঝুঁকির মূল্যায়ন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত গভীর সমুদ্রে খনিজ উত্তোলন স্থগিত রাখার আহ্বান জানিয়েছে আইইউসিএন। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার বিরল স্তন্যপায়ী প্রাণী নামব্যাট দীর্ঘদিনের সংরক্ষণ প্রচেষ্টার ফলে ‘বিপন্ন’ অবস্থা থেকে ‘ঝুঁকির কাছাকাছি’ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। কয়েক দশক আগে যেখানে এদের সংখ্যা মাত্র ৩০০-তে নেমে এসেছিল, এখন তা বেড়ে হয়েছে দুই থেকে তিন হাজার। অস্ট্রেলিয়ার পাঁচটি মারসুপিয়াল বা থলিধারী স্তন্যপায়ী প্রাণীকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, বন্য বিড়াল ও শিয়ালের আক্রমণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন এই বিলুপ্তির প্রধান কারণ। এ ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা ও নামিবিয়ার মরুভূমি নিবাসী ডেজার্ট রেইন ফ্রগ-এর অবস্থারও অবনতি হয়েছে। হীরের খনি, জ্বালানি অবকাঠামো এবং গ্রিন হাইড্রোজেন প্রকল্পের সম্প্রসারণে আগামী দুই দশকে এর আবাসস্থলের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এ প্রজাতির জন্য নতুন বিপদ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থলভাগ থেকে গভীর সমুদ্র- পৃথিবীর প্রায় সব বাস্তুতন্ত্রই এখন মানুষের কর্মকাণ্ডের চাপে পড়েছে। তাই জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগ নেওয়া না হলে আরও বহু বিরল প্রজাতি অদূর ভবিষ্যতে হারিয়ে যেতে পারে।
সূত্র: Nature . com ; July; 2026
