সম্মানিত হলেন মণীন্দ্র আগরওয়াল

সম্মানিত হলেন মণীন্দ্র আগরওয়াল

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৫ জুন, ২০২৬

বিশ্বের অন্যতম সেরা বৈজ্ঞানিক সম্মান পেলেন আইআইটি কানপুরের ডিরেক্টর মণীন্দ্র আগরওয়াল। তিনি রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হয়েছেন। বিজ্ঞানীদের কাছে এই সম্মান অনেকটা জীবনকৃতির স্বীকৃতির মতো। কারণ, এই তালিকায় নাম ওঠে শুধু সেই সব মানুষের, যাঁদের গবেষণা বদলে দেয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দিশা। নিউটন, আইনস্টাইনের মতো কিংবদন্তিরাও একসময় এই রয়্যাল সোসাইটির ফেলো ছিলেন। এবার সেই তালিকায় জায়গা করে নিলেন ভারতের মণীন্দ্র আগরওয়াল। তাত্ত্বিক কম্পিউটার বিজ্ঞান ও গণিতের জগতে মণীন্দ্র আগরওয়ালের নাম বহুদিন ধরেই অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। বিশেষ করে ‘AKS প্রাইম্যালিটি টেস্ট’-এর জন্য তিনি আন্তর্জাতিক পরিচিতি পান। ২০০২ সালে তাঁর দুই ছাত্র নীরজ কয়াল এবং নীতিন সাক্সেনার সঙ্গে মিলে তিনি এমন একটি অ্যালগরিদম তৈরি করেছিলেন, যা গণিতের বহু পুরনো এক সমস্যার কার্যকর সমাধান দেয়। সমস্যাটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনও সংখ্যা মৌলিক কি না, তা দ্রুত ও নিশ্চিতভাবে বোঝা যাবে কিভাবে? শুনতে সাধারণ মনে হলেও, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আধুনিক ডিজিটাল নিরাপত্তার এক বড় অংশ। অনলাইন ব্যাঙ্কিং, পাসওয়ার্ড সুরক্ষা, এনক্রিপশন, সব ক্ষেত্রেই মৌলিক সংখ্যার ব্যবহার রয়েছে। তাই এই সমস্যা সমাধান শুধু গণিতের সাফল্য ছিল না, ছিল প্রযুক্তি জগতের জন্যও এক বড় অর্জন। AKS টেস্টের আগে প্রাইম নাম্বার নির্ণয়ের বেশিরভাগ পদ্ধতিই সম্ভাবনার উপর নির্ভর করত। অর্থাৎ, ফলাফল অনেকটাই অনুমানভিত্তিক ছিল। তবে মণীন্দ্র আগরওয়াল ও তাঁর সহকর্মীদের আবিষ্কারের ফলে এখন অনেক বেশি নির্ভুল ও কার্যকরভাবে এই পরীক্ষা করা যায়। আর এই কারণেই AKS প্রাইম্যালিটি টেস্টকে তাত্ত্বিক কম্পিউটার বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম বড় মাইলফলক ধরা হয়। আজকের দিনে হয়তো আরও দ্রুত কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, তবুও AKS টেস্টের গুরুত্ব এতটুকু কমেনি। কারণ, এটি বিজ্ঞানীদের ‘একদা অসম্ভব’ বলে মনে হওয়া সমস্যারই নিখুঁত সমাধান খুঁজে দিয়েছিল। গবেষণার জন্য মণীন্দ্র আগরওয়াল ও তাঁর সহকর্মীরা গ্যোডেল প্রাইজ এবং ফলকারসন প্রাইজের মতো আন্তর্জাতিক সম্মানও পেয়েছেন।

উত্তরপ্রদেশে জন্ম মণীন্দ্রর। আইআইটি কানপুর থেকে পড়াশোনা শেষ করে পরে সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন প্রতিষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ। বর্তমানে তিনি আইআইটি কানপুরের ডিরেক্টর। গবেষণার পাশাপাশি শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠান গঠনের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। রয়্যাল সোসাইটি নিজেই এক বিশাল ইতিহাসের অংশ। ১৬৬০ সালে ব্রিটেনে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা বিশ্বের প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলির একটি। প্রতি বছর খুব অল্প সংখ্যক বিজ্ঞানীকেই এই সংস্থার ফেলো হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। ইতিহাসে ২৮০-রও বেশি নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী এই সংস্থার সদস্য ছিলেন। ভারতের ক্ষেত্রেও এই সম্মানের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। শ্রীনিবাস রামানুজন, সি ভি রামন, জগদীশচন্দ্র বসু, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, হোমি ভাবা, সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখরের মতো বিজ্ঞানী এই স্বীকৃতি পেয়েছেন। সেই ধারাতেই এবার যুক্ত হল মণীন্দ্র আগরওয়ালের নাম। তাঁর এই সাফল্যের বিশেষ তাৎপর্য অন্য জায়গায়ও রয়েছে। কারণ, তিনি ভারতের মাটিতে থেকেই আধুনিক তাত্ত্বিক কম্পিউটার বিজ্ঞানে বিশ্বমানের গবেষণা করেছেন। তাঁর এই সম্মান তাই শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, ভারতীয় গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রেরও বড় স্বীকৃতি। বিশেষ করে আইআইটি কানপুরের মতো প্রতিষ্ঠানের গবেষণার মান যে আন্তর্জাতিক স্তরে কতটা শক্তিশালী, সেটাও আবার সামনে এল। অনেক তরুণ গবেষক ও ছাত্রছাত্রীর কাছে মণীন্দ্র আগরওয়ালের এই যাত্রা নিঃসন্দেহে প্রেরণাদায়ক।

 

সূত্র: টাইমস অফ ইন্ডিয়া, মে, ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 − one =