‘সর্বশ্রেষ্ঠত্ববাদে’র মনস্তাত্ত্বিক মাশুল

‘সর্বশ্রেষ্ঠত্ববাদে’র মনস্তাত্ত্বিক মাশুল

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১১ জুন, ২০২৬

গত ৩৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যের কলেজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সর্বশেষ্ঠ হওয়ার দৌড় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০০০ সালের পর থেকে এমন এক ধরনের পারফেকশনিজম বা ‘সর্বশ্রেষ্ঠত্ববাদ’ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তরুণদের মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে। তারা ক্রমশ ব্যর্থতার ভয়ে, লোকে কী বলবে সেই ভয়ে উদ্বেগ এবং সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। এই বিষয় নিয়ে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের মনোবিজ্ঞানী টমাস কারান ও তাঁর সহকর্মীরা ১৯৮৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পরিচালিত ৩০৭টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এতে প্রায় ৮৩ হাজার কলেজ শিক্ষার্থীর তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। দেখা যাচ্ছে, বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা নিজেদের সাফল্য নিয়ে আগের যে কোনো যুগের তুলনায় বেশি উদ্বিগ্ন। তারা শুধু উচ্চ লক্ষ্য স্থির করছে না, সেই লক্ষ্য পূরণ না করতে পারার আশঙ্কায় মানসিক চাপে ভুগছে। এই চাপের সঙ্গে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, আত্মক্ষতি এবং আত্মহত্যার চিন্তারও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

‘নিওলিবারল’ আর্থিক ব্যবস্থা অতিরিক্ত প্রতিযোগিতাভিত্তিক। এই ব্যবস্থায় একজন মানুষের মূল্যায়ন করা হয় তার অর্জন, আয় বা পেশাগত সাফল্যের ভিত্তিতে। ফলে মানুষ নিজের সুখ, সম্পর্ক বা জীবনের অর্থ খোঁজার বদলে নিজের বাজার-মূল্য বাড়ানোর দৌড়ে নেমে পড়ে। অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘সর্বশ্রেষ্ঠত্ববাদ’ও বাড়ে। আয়-বৈষম্য যত বেশি, তরুণদের মধ্যে ব্যর্থতার ভয় এবং আত্মসন্দেহও তত বেশি। অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে গেলে মানুষ আরও বেশি নিজের ওপর চাপ তৈরি করে।

‘সর্বশ্রেষ্ঠত্ববাদ’কে অনেকেই শুধু উচ্চ মানদন্ড স্থির করার প্রবণতা বলে মনে করেন। কিন্তু কারানের মতে, বিষয়টি আরও গভীর। ‘সর্বশ্রেষ্ঠত্ববাদ’ শুধু নিজের কাছে বেশি প্রত্যাশা রাখার বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অন্যের বিচার ও প্রত্যাশার আশঙ্কাও। মনোবিজ্ঞানী হর্নি দেখিয়েছিলেন, সমাজের চাপ মানুষকে এমন এক আদর্শের পেছনে ছুটতে বাধ্য করে, যা বাস্তবে অর্জন করা কঠিন। বাইরে থেকে নিখুঁত দেখানোর চেষ্টা চললেও ভেতরে জমতে থাকে উদ্বেগ, অপরাধবোধ ও আত্মসন্দেহ। টমাস কারানের মতে, আজ সেই সামাজিক চাপ আরও গভীরভাবে মানুষের ভেতরে ঢুকে গেছে। অনেকেই মনে করেন নিখুঁত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাদের নিজস্ব ইচ্ছা, অথচ আসলে সেটা সামাজিক প্রত্যাশারই প্রতিফলন। ফলে সামান্য ব্যর্থতাও তাদের কাছে বড় আঘাত হয়ে আসে। ব্যর্থতার ভয়ে তারা অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করতেও দ্বিধা করে। এই প্রবণতা সামাজিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলে। অন্যের স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য ‘সর্বশ্রেষ্ঠত্ববাদী’রা নিজেদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, যা সম্পর্ককে কৃত্রিম করে তোলে। ধীরে ধীরে তারা নিজেকে বিচ্ছিন্ন ও একাকী অনুভব করে। গবেষকদের মতে, এই নিঃসঙ্গতাই উদ্বেগ ও বিষণ্নতার অন্যতম বড় কারণ। তাই ‘সর্বশ্রেষ্ঠত্ববাদ’কে শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবেও দেখতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের শেখানো জরুরি যে মানুষের মূল্য শুধু সাফল্য বা নম্বরে নয়, বস্তুত শেখার আনন্দ, কৌতূহল, সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত বিকাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

 

সূত্র: Nautilus ; June ; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × one =