সহযোগিতা ও সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তা

সহযোগিতা ও সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তা

সুপর্ণা চট্টোপাধ্যায়
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ২ মে, ২০২৬

পৃথিবীর সবচেয়ে সফল প্রজাতিগুলোর একটি মানুষ। কিন্তু এই সাফল্যের কারণ শুধু মানুষের শক্তি, গতি বা শারীরিক ক্ষমতা নয়। মানুষকে অন্য প্রাণী থেকে আলাদা করেছে তার একসঙ্গে কাজ করার ক্ষমতা, জ্ঞান ভাগ করে নেওয়ার অভ্যাস এবং দলগতভাবে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা। বিজ্ঞানীরা এই শক্তিকে বলেন সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তা বা Collective Intelligence (CI)। সহজ ভাষায়, যখন অনেক মানুষ নিজেদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও চিন্তা একত্র করে কোনো সমস্যা সমাধান করে, তখন সেটাই হয় সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তা। সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে সাধারণ রূপ দেখা যায় প্রকৃতিতেই। যেমন পিঁপড়ের কলোনি বা মাছের ঝাঁকে। সেখানে প্রতিটি সদস্য খুব সহজ কিছু নিয়ম মেনে চলে, কিন্তু সেই ছোট ছোট আচরণ মিলেই বড় ও কার্যকর ফল তৈরি হয়। একটি পিঁপড়ে একা খুব বেশি কিছু করতে পারে না, কিন্তু হাজার পিঁপড়ে একসঙ্গে খাদ্য খুঁজে বের করতে, বাসা তৈরি করতে বা বিপদ এড়াতে সক্ষম হয়। একইভাবে মাছের ঝাঁক শিকারির হাত থেকে বাঁচতে একসঙ্গে দিক পরিবর্তন করে। এখানে কোনো কেন্দ্রীয় নেতা না থাকলেও দলগত আচরণ সফল সিদ্ধান্ত এনে দেয়। তবে কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তা আরও উন্নত স্তরে পৌঁছায়। সেখানে জটিল যোগাযোগ ব্যবস্থা, যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নেতৃত্ব এবং শেখার সংস্কৃতি দেখা যায়। এই জায়গাতেই মানুষ অন্য সব প্রজাতির থেকে আলাদা। প্রাচীনকালে মানুষের জীবন ছিল কঠিন। তখন মানুষকে খাবারের জন্য শিকার করতে হতো, বুনো ফল সংগ্রহ করতে হতো, মাটি খুঁড়ে শিকড় তুলতে হতো। এসব কাজ একা করা সহজ ছিল না। বড় পশু শিকার করতে হলে দলবদ্ধভাবে পরিকল্পনা করতে হতো। কেউ শিকার করত, কেউ পাহারা দিত, কেউ আবার খাবার ভাগ করে দিত। এই কারণেই মানুষের সমাজে ‘সহযোগিতা’ খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অন্য প্রাণীরা সাধারণত নিজের পরিবার বা আত্মীয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু মানুষ, আত্মীয়ের বাইরে, আনাত্মীয়দের সঙ্গেও কাজ করতে শিখেছে। এটাই মানুষের বড় শক্তি। মানুষের মস্তিষ্ক তুলনায় বেশি উন্নত। এই মস্তিষ্ক আমাদের চিন্তা, পরিকল্পনা, ভাষা ও কল্পনার ক্ষমতা দিয়েছে। তবে বড় মস্তিষ্কের জন্য একটি মূল্যও দিতে হয়েছে। মানব-শিশুদের দীর্ঘ সময় ধরে নির্ভরশীল থাকতে হয়। একটি মানবশিশু নিজে নিজে বাঁচতে পারে না। তাকে বড় করতে বাবা-মা, দাদা-দাদি, আত্মীয়স্বজন এমনকি সমাজের সাহায্য লাগে। তাই মানব সমাজে প্রজন্মের পর প্রজন্ম একে অপরকে সাহায্য করার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।

 

মানুষের সাফল্যের আরেকটি বড় কারণ হলো, ভাষা। ভাষার মাধ্যমে মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা অন্যকে জানাতে পারে, পরিকল্পনা করতে পারে, সতর্কবার্তা দিতে পারে এবং নতুন ধারণা ছড়িয়ে দিতে পারে। যেমন যখন কেউ আগুন জ্বালানোর পদ্ধতি শিখেছিল সে অন্যদের ও শেখাতে পেরেছিল হয়ত। ফলে সবাই এই ভাগ করে নেওয়া অভিজ্ঞতার সুবাদে নতুন দক্ষতা অর্জন করে। এই জ্ঞান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। ভাষা না থাকলে সভ্যতা, বিজ্ঞান, সাহিত্য বা প্রযুক্তি কোনোটাই আজকের অবস্থায় পৌঁছাত না। অনেক প্রাণী আছে, যারা দেখে দেখে শেখে। কিন্তু মানুষ শুধু শেখে না, সে অন্যকেও শেখায়। মা-বাবা সন্তানকে শিক্ষা দেয়, শিক্ষক ছাত্রকে শেখায়, কারিগর নতুন কর্মীকে দক্ষতা শেখায়। এই শেখানো ও শেখার ধারাই মানুষের সমাজকে এগিয়ে নিয়েছে। কৃষিকাজ, ধাতুর ব্যবহার, চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, শিল্প- সবই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে আরও উন্নত হয়েছে।

 

গবেষকেরা বলেন, মানুষের সমাজে সমতার বোধ খুব গভীর। মানুষ অন্যায় বৈষম্য সহজে মেনে নিতে চায় না। প্রাচীন শিকারি সমাজে কেউ যদি বেশি ক্ষমতা দেখাতে চাইত, তাকে সমালোচনা করা হতো বা সমাজ থেকে দূরে রাখা হতো। এতে সমাজে এক ধরনের ভারসাম্য বজায় থাকত। সবাই মতামত দিতে পারত, আলোচনা করতে পারত, একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে পারত। যদিও মানুষ সমতা পছন্দ করে, তবু প্রয়োজন হলে নেতৃত্বও মেনে নেয়। যখন কোনো ব্যক্তি বেশি জ্ঞানী, দক্ষ বা অভিজ্ঞ হন, তখন সে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব দেয়। যেমন, শিকারের সময় একজন দক্ষ শিকারি নেতৃত্ব দিতে পারে, আবার অসুস্থতার সময় একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এই নমনীয় নেতৃত্ব সমাজকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

 

আজকের পৃথিবীতে সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। গত ২৫০ বছরে প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির পরিবর্তনের গতি মানুষের ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুত। ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোটি কোটি মানুষকে একসঙ্গে যুক্ত করেছে। এখন একজন বিজ্ঞানী এক দেশে বসে অন্য দেশের গবেষকের সঙ্গে কাজ করতে পারেন। একজন ছাত্র বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন ক্লাস করতে পারে। সাধারণ মানুষও বিভিন্ন প্রকল্পে অংশ নিয়ে গবেষণায় সাহায্য করতে পারে। আধুনিক গণতন্ত্রেও এই ধারণার ব্যবহার হচ্ছে। অনেক দেশে নাগরিকদের মতামত নিয়ে বাজেট তৈরি করা হয়, আইন সংস্কার করা হয়, নীতি নির্ধারণ করা হয়। এতে সিদ্ধান্ত আরও গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর হয়। জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট- এসব সমস্যা কোনো এক ব্যক্তি বা এক দেশের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। দরকার বিশ্বব্যাপী সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় ও যৌথ পরিকল্পনা।

 

সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তাকে শুধু অতীত বোঝার জন্য নয়, ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন, বহু গবেষক। কারণ আজকের পৃথিবীর বড় বড় সমস্যাগুলি, কোনো একজন ব্যক্তি, একটি সংস্থা বা একটি দেশের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, গণঅভিবাসন, আয় বৈষম্য, মহামারি, খাদ্য সংকট বা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মতো সমস্যাগুলো জটিল ও বহুমাত্রিক। এগুলোকে “উইকেড প্রবলেম’’ বলা হয়—অর্থাৎ এমন সমস্যা, যার সহজ বা একক সমাধান নেই। এখানে বহু পক্ষ জড়িত , বহু মতামত থাকে। সমাধানের জন্য বহু মানুষের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দরকার হয়। এই কারণেই কিছু বিজ্ঞানী সম্মিলিত আচরণ নিয়ে গবেষণাকে “সংকটকালীন চর্চা ক্ষেত্র’’ বা crisis discipline বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, মানবজাতির সামনে যে সংকটগুলো দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো মোকাবিলায় এই গবেষণা এখন জরুরি প্রয়োজন। সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আধুনিক গবেষণার লক্ষ্য হলো, কীভাবে দলগত সিদ্ধান্তকে আরও কার্যকর করা যায়, কীভাবে প্রযুক্তির সাহায্যে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জ্ঞানকে একত্র করা যায়, এবং কীভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রের গবেষকদের একসঙ্গে কাজ করানো যায়। বিশেষজ্ঞদের আশা, জীববিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও নীতিনির্ধারণের সমন্বয়ে এই ক্ষেত্র আরও এগোবে। কারণ ভবিষ্যতের পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে মানবজাতির সবচেয়ে বড় ভরসা হবে, অনেক মস্তিষ্কের সম্মিলিত শক্তি।

 

সূত্র: The Royal Society Publishing; April, 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 − 13 =