সুনামির বিলম্বিত ক্ষতচিহ্ন  

সুনামির বিলম্বিত ক্ষতচিহ্ন  

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১ নভেম্বর, ২০২৬

প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কিছু ক্ষত শুধু ধ্বংসস্তূপেই নয়, মানুষের শরীরেও তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে যায়। ২০০৪ সালে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে ভয়াবহ সুনামিতে প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, যা ছিল ওই অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ। সেই বিপর্যয়ের পর দুই দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সুনামির প্রত্যক্ষদর্শীদের শরীরে তার প্রভাব রয়ে গিয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। গবেষণায় দেখা গেছে, সুনামিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা রয়েছে। তাদের থাইরক্সিন হরমোনের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম। পাশাপাশি তাদের স্থূলতা, হৃদ্‌রোগ ও রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি প্রভৃতি সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতাও বেশি।

এই গবেষণার আরেকটি বিশেষত্ব হল, সুনামির ঠিক আগেই ওই অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য ও আর্থসামাজিক পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। ফলে গবেষকরা এই গবেষণাটির জন্য নিজেদের অজান্তেই একটা বিরল সুযোগ পেয়ে যান। সেই সময় সংগৃহীত তথ্যের মধ্যে ছিল মানুষের রক্তচাপ, শরীরের চর্বির পরিমাণ এবং অন্যান্য শারীরিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কিত পরিমাপ। পরবর্তী প্রায় ২০ বছরের তথ্যের সঙ্গে এই প্রাথমিক উপাত্ত তুলনা করে গবেষকেরা খুব সহজেই বুঝতে পারেন, বিপর্যয়টি দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলেছে।

গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল bioRxiv-এ প্রকাশিত হয়েছে। তবে প্রতিবেদনটি এখনও বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পর্যালোচিত হয়নি। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সুনামির ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এবং তার পরবর্তী মানসিক চাপ মানুষের থাইরয়েড গ্রন্থির স্বাভাবিক কার্যক্রমে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন ঘটিয়েছে।

থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হরমোন শরীরের বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শরীর খাদ্য থেকে শক্তি উৎপাদন করে এবং শক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে। তাই থাইরক্সিন হরমোনের মাত্রা কমে গেলে বিপাকক্রিয়া ব্যাহত হয়। এর প্রভাব শরীরের ওজন, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা এবং হৃদ্‌স্বাস্থ্যের ওপর পরে।

গবেষণাপত্রের অন্যতম লেখক ড্যানিয়েল হখবাউমের মতে, বর্তমানে ওই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা বাইরে থেকে প্রায় একই রকম মনে হলেও তাঁদের শরীরে বিপর্যয়ের দীর্ঘস্থায়ী জৈবিক ছাপ রয়ে গিয়েছে। এই পরিবর্তন পরবর্তীতে তাঁদের স্বাস্থ্যকে আরও প্রভাবিত করবে বলে গবেষকদের ধারণা। একটা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রভাব তো শুধু তাৎক্ষণিক প্রাণহানি ও পরিকাঠামোর ক্ষতিতেই শেষ হয় না। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে এমনভাবে প্রভাব ফেলে, যার পরিণতি কয়েক দশক পরে হলেও অনুভূত হতে বাধ্য।

 

সূত্র: Prayers and tears mark 20 years since the Indian Ocean tsunami that killed some 230,000 people By REZA SAIFULLAH and EDNA TARIGAN, Science Advances, December 26, 2024.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen + eight =