আইসল্যান্ড ছিল উত্তরমেরুর একমাত্র দেশ, যেখানে স্বাভাবিকভাবে মশার অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু সেই ব্যতিক্রমও এখন অতীত হতে বসেছে। ২০২৫ সালে রাজধানী রেইকিয়াভিকের উত্তরে প্রথমবারের মতো মশার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি নিছক একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দ্রুত বদলে যাওয়া সুমেরু অঞ্চলের পরিবেশের সতর্কতা সংকেত। উষ্ণতা বৃদ্ধি, মানুষের ক্রমবর্ধমান কার্যকলাপ এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের পরিবর্তনের ফলে উত্তর মেরু অঞ্চল নতুন জৈবিক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
সুমেরু অঞ্চলে মশা, মাকড়শা এবং অসংখ্য পোকামাকড়সহ আর্থ্রোপড প্রাণীগোষ্ঠী প্রকৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আকারে ক্ষুদ্র হলেও পরিবেশে তাদের ভূমিকা বিশাল। তারা ফুলের পরাগমিলনে সাহায্য করে, মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণী পচিয়ে মাটিতে পুষ্টি ফিরিয়ে দেয়, অন্যান্য প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে এবং খাদ্যশৃঙ্খলকে সচল রাখে। উদ্ভিদ, পাখি, বন্যপ্রাণী এবং মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে এদের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, সুমেরুতে এদের ওপর নিয়মিত ও সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থা প্রায় নেই। ফলে কোথায় কোন প্রজাতি বাড়ছে, কোথায় কমছে, বা কোন নতুন বিপদ তৈরি হচ্ছে সেটা বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই জ্ঞানশূন্যতা এখন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে, কারণ সুমেরু অঞ্চল পৃথিবীর গড়ের তুলনায় প্রায় চার গুণ দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। বরফ আগেভাগে গলছে, গ্রীষ্ম দীর্ঘ হচ্ছে এবং দাবানলের মতো ঘটনা বেড়েই চলেছে। এসব পরিবর্তন পোকামাকড়ের জীবনচক্র, বিস্তার এবং বেঁচে থাকার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।
এর প্রভাব ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। অনেক উপকূলীয় পাখির ছানা ডিম ফুটে বের হওয়ার সময় পর্যাপ্ত পোকামাকড় পাচ্ছে না, কারণ আবহাওয়ার পরিবর্তনে খাদ্য ও প্রজননের সময়সূচি আর মিলছে না। আবার ক্যারিবু ও বল্গা হরিণ জাতীয় প্রাণীরা রক্তচোষা পোকামাকড়ের আক্রমণে বেশি ভুগছে। এতে তাদের চরে বেড়ানো কমে যায়, শক্তি খরচ বাড়ে , প্রজনন ও স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কিছু কীটপতঙ্গের আক্রমণে তুন্দ্রা অঞ্চলের উদ্ভিদ ধ্বংস হচ্ছে, যা মাটির তাপমাত্রা বাড়িয়ে বরফ গলন ত্বরান্বিত করতে পারে। এর ফলে গ্রিনহাউস গ্যাস ও সুপ্ত জীবাণু মুক্ত হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
একই সময়ে সুমেরু বহির্বিশ্বের সঙ্গে আরও বেশি সংযুক্ত হচ্ছে। নৌপরিবহন, পর্যটন, সামরিক তৎপরতা ও অবকাঠামো নির্মাণ বাড়ছে। ফলে বাইরের নতুন প্রজাতি সহজে প্রবেশ করছে। আইসল্যান্ডে মশার আগমন তারই উদাহরণ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখন জরুরি ভিত্তিতে একটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার, যাতে সুমেরু অঞ্চলের পোকামাকড় ও তাদের প্রভাব নিয়মিতভাবে নজরে রাখা যায়। এ কাজে স্থানীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা হবে অপরিহার্য সম্পদ। কারণ তারাই দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃতির সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো সবচেয়ে আগে লক্ষ্য করে আসছেন।
আইসল্যান্ডের মশা কেবল নতুন উপদ্রব নয়, এটি আর্কটিকের দ্রুত বদলে যাওয়া ভবিষ্যতের স্পষ্ট সতর্কসংকেত। প্রশ্ন এখন, এ নয় যে মশা কীভাবে এলো; প্রশ্ন হলো, পরবর্তী পরিবর্তন আসার আগেই মানুষ কি তা বুঝে ব্যবস্থা নিতে পারবে?
সূত্র: The Arctic’s growing mosquito problem by Amanda M. Koltz and Lauren E. CullerAuthors Info & Affiliations
Science, 16 Apr 2026,Vol 392, Issue 6795 p. 235, DOI: 10.1126/science.aeh9505
