সেপসিস-এর ব্যক্তিনির্দিষ্ট চিকিৎসা

সেপসিস-এর ব্যক্তিনির্দিষ্ট চিকিৎসা

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২০ জুলাই, ২০২৬

প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার প্রায় ২০ শতাংশের পেছনে রয়েছে ‘সেপসিস’। অথচ প্রাণঘাতী এই অবস্থাটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা এখনও খুবই কম। শুধু তাই নয়, কোভিড-১৯ মহামারির সময় গুরুতর অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়া অনেক রোগীর শরীরেও সেপসিসের মতো একই ধরনের জৈবিক পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। তাই ভবিষ্যতের মহামারি মোকাবিলাতেও সেপসিস সম্পর্কে গভীর বোঝাপড়া গুরুত্বপূর্ণ। সেপসিস আসলে আলাদা কোনো সংক্রমণ নয়। শরীরে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা ছত্রাকের সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কখনও কখনও অস্বাভাবিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। তখন সংক্রমণের পাশাপাশি শরীর নিজের টিস্যু ও অঙ্গেরও ক্ষতি করতে শুরু করে। ফলে একে একে ফুসফুস, কিডনি, লিভার, হৃদ্‌যন্ত্র বা মস্তিষ্ক বিকল হয়ে পরে। এমনকি সময়মতো চিকিৎসা না হলে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। বর্তমানে সেপসিসের চিকিৎসা মূলত অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্যান্য জীবাণুনাশক ওষুধ এবং নিবিড় পরিচর্যার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই পদ্ধতি সব রোগীর ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর হয় না। কারণ, সেপসিস সব মানুষের শরীরে একইভাবে দেখা দেয় না। একই রোগ হলেও একেকজনের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া একেক রকম হতে পারে। এমনকি একই রোগীর ক্ষেত্রেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোগের ধরন বদলে যেতে পারে। সমস্যার সমাধানে বিজ্ঞানীরা এখন ‘সিস্টেমস ইমিউনোলজি’-র দিকে নজর দিচ্ছেন। এটি এমন একটি গবেষণাপদ্ধতি, যেখানে জিন, প্রোটিন, বিপাকীয় উপাদানসহ শরীরের নানা জৈবিক তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয়। তাছাড়া আরএনএ সিকোয়েন্সিং, মাল্টি-ওমিক্স, মেশিন লার্নিং এবং উন্নত বায়োইনফরমেটিক্স প্রযুক্তিও এর সাথে যুক্ত। লক্ষ্য একটাই, প্রতিটি রোগীর শরীরে ঠিক কী ঘটছে, তা যত দ্রুত সম্ভব বুঝে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া। সেপসিসের একেবারে শুরুর দিকেই রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন শুরু হয়। রোগীর জিনের কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করে এই পরিবর্তনের বিশেষ ‘জিন এক্সপ্রেশন সিগনেচার’ শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। ভবিষ্যতে এগুলিই রোগ দ্রুত নির্ণয় এবং চিকিৎসা শুরু করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। আশার কথা, বিজ্ঞানীরা এখন সেপসিস রোগীদের বিভিন্ন ‘এন্ডোটাইপ’ বা জৈবিক উপধরনে ভাগ করতে পারছেন। একই রোগ হলেও এই উপধরনগুলোর রোগপ্রক্রিয়া, জটিলতা এবং মৃত্যুঝুঁকি ভিন্ন। ফলে ভবিষ্যতে সব রোগীকে একই চিকিৎসা না দিয়ে, তাঁর শরীরের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ব্যক্তিনির্দিষ্ট বা প্রিসিশন মেডিসিন প্রয়োগ করা সম্ভব হতে পারে। সেপসিসের প্রভাব শুধু হাসপাতালে থাকার সময়েই শেষ হয় না। অনেক রোগী দীর্ঘদিন শারীরিক ও মানসিক নানা সমস্যায় ভোগেন, যাকে পোস্ট-সেপসিস সিনড্রোম বলা হয়। একই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা লং কোভিড আক্রান্তদের মধ্যেও দেখা যায়। এপিজেনেটিক পরিবর্তন, অর্থাৎ ডিএনএ-র গঠন না বদলিয়েও জিনের কার্যকলাপে যে পরিবর্তন ঘটে, এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার পেছনে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রক্রিয়াটি বোঝা গেলে ভবিষ্যতে নতুন ধরনের চিকিৎসার পথ খুলে যেতে পারে। তবে এই প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণার পথে বেশ কিছু বাধাও রয়েছে। মাল্টি-ওমিক্স বিশ্লেষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ ব্যয়বহুল, পর্যাপ্ত সংখ্যক রোগীর তথ্য এখনও সীমিত, সেপসিস নিয়ে গবেষণার জন্য উপযুক্ত প্রাণী মডেলও খুব কম। পাশাপাশি চিকিৎসাব্যবস্থাকেও প্রচলিত ‘একই চিকিৎসা সবার জন্য’ এই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে প্রিসিশন মেডিসিন অর্থাৎ ব্যক্তিনির্দিষ্ট চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।

সূত্র: Frontiers in Science

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four + seven =