সৌরজগত পেরিয়ে গেল ভয়েজার ১ 

সৌরজগত পেরিয়ে গেল ভয়েজার ১ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৫ অক্টোবর, ২০২৬

১৯৭৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর নাসা ভয়েজার ১ মহাকাশে পাঠিয়েছিল। তখন কেউ হয়তো ভাবেনি যে প্রায় পাঁচ দশক পরেও এই মহাকাশযান পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলবে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষদিকে দেখা গেল, মানুষের তৈরি সবচেয়ে দূরবর্তী বস্তু হিসেবে পৃথিবী থেকে প্রায় ১৬০০ কোটি মাইল দূরে অবস্থান করছে ভয়েজার ১। এত বিপুল দূরত্ব সত্ত্বেও এর ক্ষীণ রেডিও সংকেত এখনও পৃথিবীর অ্যান্টেনায় পৌঁছচ্ছে।

১৯৭০-এর দশকে সৌরজগতের বাইরের গ্রহগুলি অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল এই মহাকাশযান। ১৯৭৯ সালে এটি বৃহস্পতির পাশ দিয়ে এবং ১৯৮০ সালে শনির পাশ দিয়ে উড়ে যায়। সেই অভিযানে বৃহস্পতি ও শনির উপগ্রহ, বলয় এবং বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ছবি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করে ভয়েজার ১। এরপর আর পিছনে না ফিরে এটি এগিয়ে যেতে থাকে সৌরজগতের বহির্ভাগের দিকে।

ভয়েজার ১-এর যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ২০১২ সালের আগস্ট মাস। তখন মহাকাশযানটি সূর্যের সৌরবায়ু ও চৌম্বকক্ষেত্রের তৈরি সুরক্ষাবলয় হেলিওপজ অতিক্রম করে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশে প্রবেশ করে। এর ফলে এটি প্রথম মানবনির্মিত মহাকাশযান হিসেবে সূর্যের প্রভাববলয়ের বাইরের পরিবেশ সরাসরি পরিমাপ করার সুযোগ পায়। সেই অঞ্চলকে ঘিরে সংগৃহীত তথ্য বিজ্ঞানীদের আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যম বা সৌরজগতের বাইরের মহাশূন্যের প্রকৃতি বুঝতে সাহায্য করছে।

ভয়েজার ১-এর শক্তির উৎসও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে ব্যবহৃত হয়েছে প্লুটোনিয়াম-২৩৮-ভিত্তিক রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটর (RTG)। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর উৎপাদিত শক্তি কমে আসছে। তাই শক্তি সাশ্রয়ের জন্য বছরের পর বছর ধরে মহাকাশযানের কিছু যন্ত্র ও ব্যবস্থা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। তবুও কয়েকটি বৈজ্ঞানিক যন্ত্র এখনও সক্রিয় রয়েছে। এগুলি মহাজাগতিক রশ্মি, চৌম্বকক্ষেত্র এবং প্লাজমা তরঙ্গ পরিমাপ করে আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পৃথিবীতে পাঠাচ্ছে।

ভয়েজার ১-এর পৃথিবীতে পাঠানো সংকেত অত্যন্ত দুর্বল। এটি মাত্র প্রায় ২২ ওয়াট শক্তি ব্যবহার করে রেডিও সংকেত পাঠায়। সেই সংকেত পৃথিবীতে পৌঁছতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা সময় লাগে। নাসার ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক (DSN)-এর বিশাল অ্যান্টেনাগুলি সেই ক্ষীণ সংকেত গ্রহণ করে। এত দীর্ঘ দূরত্ব এবং ক্রমশ কমে আসা শক্তির মধ্যেও প্রকৌশলীরা কিন্তু এখনও মহাকাশযানটিতে নির্দেশ পাঠাতে এবং তার কাছ থেকে টেলিমেট্রি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য গ্রহণ করতে সক্ষম হচ্ছেন।

ভয়েজার ১ শুধু বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের যন্ত্র নয়, এটি মানবসভ্যতার একটি প্রতীকী বার্তাবহ। মহাকাশযানটির সঙ্গে রয়েছে বিখ্যাত গোল্ডেন রেকর্ড। এতে পৃথিবীর বিভিন্ন শব্দ, ছবি ও মানবসভ্যতা সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। কোনও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আবিষ্কারক এই মহাকাশযান খুঁজে পেলে তার মাধ্যমে পৃথিবী ও মানুষের পরিচয় যাতে পায় সেই সম্ভাবনাই ছিল এই রেকর্ডের মূল উদ্দেশ্য।

২০২৬ সালের নভেম্বরে ভয়েজার ১ এক আলোক-দিনের দূরত্ব অতিক্রমের কাছাকাছি পৌঁছবে। অর্থাৎ পৃথিবী থেকে পাঠানো আলো বা রেডিও সংকেতেরও এই দূরত্ব অতিক্রম করতে প্রায় এক দিন সময় লাগবে। ১৯৭৭ সালে যাত্রা শুরু করা একটি প্রযুক্তি কীভাবে প্রায় ৫০ বছর ধরে মহাকাশের গভীরে কাজ করে যেতে পারে, ভয়েজার ১ তার অসাধারণ উদাহরণ। এটি শুধু সৌরজগতের বাইরের অজানা জগতের তথ্যই সংগ্রহ করেনি, প্রায় পাঁচ দশক পরেও পৃথিবী ও আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যের মধ্যে এক ক্ষীণ কিন্তু অবিচ্ছিন্ন যোগাযোগের সেতু হয়ে রয়েছে।

সূত্র: NASA Science, Voyager Mission

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one + seventeen =