স্তন্যপায়ীদের লোমের সুশৃঙ্খল বিন্যাস  

স্তন্যপায়ীদের লোমের সুশৃঙ্খল বিন্যাস  

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৭ নভেম্বর, ২০২৬

প্রাণীদের শরীরে লোম কোথায়, কীভাবে এবং কোন বিন্যাসে গজায়, এই নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহল বরাবরের। সম্প্রতি জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা গাণিতিক মডেলের সাহায্যে এই ঘটনাটির এক সম্ভাব্য সহজ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, ত্বকের কোষ এবং তাদের মধ্যে রাসায়নিক সংকেতের পারস্পরিক ক্রিয়াতেই তৈরি হয় লোমের সুশৃঙ্খল বিন্যাস। এর জন্য প্রতিটি লোমকূপ কোথায় তৈরি হবে, তা নির্ধারণ করার মতো জটিল কোনও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার প্রয়োজন নাও হতে পারে।

স্তন্যপায়ীদের ভ্রূণ অবস্থাতেই ত্বকের বিশেষ কিছু কোষগুচ্ছ থেকে লোমকূপ তৈরি হতে শুরু করে। এই প্রাথমিক গঠনগুলিকে বলা হয় ‘প্ল্যাকোড’। পাখির পালক এবং অধিকাংশ ধরনের আঁশ তৈরির ক্ষেত্রেও একই ধরনের গঠন গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন প্রাণীর শরীরে এই প্ল্যাকোডের বিন্যাস আলাদা হলেও, কীভাবে ভ্রূণের ত্বকে এমন সুনির্দিষ্ট নকশা তৈরি হয়, সেটা বিতর্কিত বিষয়।

ইঁদুরের ক্ষেত্রে গবেষকদের দেওয়া প্রচলিত একটি ব্যাখ্যা হল ‘এক্সপ্যানশন-ইনডাকশন’ মডেল। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, তৈরি হওয়া প্রতিটি প্ল্যাকোড আশপাশে একটি বাধাদানকারী রাসায়নিক অণু ছড়িয়ে দেয়। ফলে কাছাকাছি নতুন প্ল্যাকোড আর তৈরি হতে পারে না। ভ্রূণের ত্বক যত বাড়তে থাকে, ততই নতুন কিছু অঞ্চল ওই রাসায়নিকের প্রভাবের বাইরে চলে আসে। তখন পুরনো প্ল্যাকোডগুলির মাঝখানে নতুন লোমকূপ তৈরির সুযোগ তৈরি হয়। তবে গবেষকরা এবার ভিন্ন একটি প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন, যার নাম ‘কেমোট্যাক্সিস’। এই প্রক্রিয়ায় কোষ রাসায়নিক সংকেতের ঘনত্বের পার্থক্য বুঝে নির্দিষ্ট দিকে ছুটে যায়। যেমন, প্রদাহের স্থানে শ্বেত রক্তকণিকা পৌঁছতে এই প্রক্রিয়া সাহায্য করে।

গবেষকরা এমন একটি গাণিতিক মডেল তৈরি করেছেন, যেখানে ত্বকের ভেতরের স্তর ডার্মিসের চলনশীল কোষগুলি ত্বকের বাইরের স্তর এপিডার্মিস থেকে নির্গত আকর্ষণকারী রাসায়নিক সংকেতের প্রতি সাড়া দেয়। ভ্রূণের ত্বক বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কোষগুলির এই পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্ল্যাকোড তৈরি হয়। মডেলটি ইঁদুরের লোমকূপের পরিচিত বিন্যাসও সফলভাবে ব্যাখ্যা করতে পেরেছে।

এরপর গবেষকরা পরীক্ষা করেন কাঁটাওয়ালা ইঁদুরের ওপর। এই প্রাণীর লোমকূপগুলি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং নির্দিষ্ট দিক অনুসরণ করে সাজানো থাকে। প্রচলিত তত্ত্ব দিয়ে এই বিশেষ বিন্যাস ব্যাখ্যা করা কঠিন। ভ্রূণের ত্বকের ত্রিমাত্রিক ছবি থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে গবেষকরা মডেলটিকে এই প্রজাতির উপযোগী করে তোলেন। তাতেও একই কেমোট্যাক্সিস প্রক্রিয়া কাঁটাওয়ালা ইঁদুরের লোমকূপের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বিন্যাস তৈরি করতে সক্ষম হয়।

এ গবেষণার বিবরণটি প্রকাশিত হয়েছে প্রোসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস পত্রিকায়। গবেষকদের মতে, বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীর লোমের বিন্যাসে পার্থক্য থাকলেও তার নেপথ্যে কাজ করতে পারে একই মৌলিক স্ব-সংগঠন প্রক্রিয়া। কোষের চলাচল ও রাসায়নিক সংকেতের পারস্পরিক ক্রিয়ার সামান্য সামান্য পরিবর্তন থেকেই তৈরি হতে পারে নানা ধরনের নকশা। তবে গাণিতিক মডেলে এই ফল পাওয়া গেলেও, জীবন্ত ত্বকে ঠিক এই প্রক্রিয়াই কাজ করে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষাভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন।

 

সূত্র: “Chemotactic self-organization captures the dynamics of mammalian hair follicle patterning” by Muhamet Ibrahimi, Ebrahim Jahanbakhsh ,et.al; 2nd July 2026, published in Proceedings of the National Academy of Sciences. DOI: 10.1073/pnas.2530407123

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eight + seven =